দক্ষিণ আফ্রিয়ায় দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত এল. ব্রেন্ট বোজেল তৃতীয় সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছেন। তার মন্তব্যকে “অকূটনৈতিক” বলে উল্লেখ করে ব্যাখ্যা চাইতে তাকে তলব করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমাবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

কূটনৈতিক মন্তব্যে বিতর্ক
পশ্চিম কেপ প্রদেশে একটি ব্যবসায়িক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে বোজেল দাবি করেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে ১৫০টিরও বেশি আইন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের প্রতি ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।
একই সঙ্গে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বিরুদ্ধেও পরোক্ষ অভিযোগ তোলেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, রামাফোসা নাকি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অপমান করেছেন।
এছাড়া বোজেল দক্ষিণ আফ্রিকার একটি আদালতের রায়ও প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে একটি বিতর্কিত বর্ণবাদবিরোধী গানকে ঘৃণামূলক বক্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালত যা-ই বলুক তাতে তার কিছু আসে যায় না।
এই মন্তব্যের পরই দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে তলব করে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা চান।

সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক কতটা নিচে নেমে গেছে তা স্পষ্ট করে। গত বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা তৈরির জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করেছিলেন। তারা বিভিন্ন প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন এবং আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের হত্যা, জমি অধিগ্রহণ নীতি এবং বর্ণবৈষম্যের উত্তরাধিকার মোকাবিলায় তৈরি আইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আর তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
রাষ্ট্রপতি রামাফোসা তার সাম্প্রতিক দুটি জাতির উদ্দেশে ভাষণে স্পষ্ট করে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না।
কেপটাউনের কৌশলগত পরামর্শ প্রতিষ্ঠান আফ্রিকা প্র্যাকটিসের উপদেষ্টা জিয়ান্ডা স্টুরম্যানের মতে, নেতিবাচক প্রচারণা বা ভুল ধারণা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা এখন প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তার মতে, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইছে না।
![]()
বিকল্প জোটের পথে দক্ষিণ আফ্রিকা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় হতে পারে। তবে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন জোট গড়ে তোলার কৌশল অনুসরণ করে আসছে, যাতে বড় শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বৈশ্বিক নীতির কারণে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা এখন একই ধরনের মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে।
যেদিন বোজেল তার বিতর্কিত বক্তব্য দেন, সেদিনই রামাফোসা ব্রাজিলে রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন। সেখানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি না থাকলে একদিন অন্য কেউ আক্রমণ করতে পারে।
এর জবাবে রামাফোসা বলেন, দুই দেশের একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
![]()
বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যম শক্তির ভূমিকা
আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির নেতা হিসেবে রামাফোসা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলে আসছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কিছু দেশ অর্থনৈতিক চাপ বা অন্যান্য উপায় ব্যবহার করে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তার মতে, ছোট বা মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকেও সম্মান দেখানো উচিত এবং তাদের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা সব সময় সেই নীতি অনুসরণ করে না। চার বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমে রুশ সেনা প্রত্যাহারের কথা বললেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে, যা ইউরোপীয় মিত্রদের অসন্তুষ্ট করে।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে দেশটির দূতাবাসে সমবেদনা জানানো নিয়েও রামাফোসা সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

সমালোচনা ও নতুন উত্তেজনা
দক্ষিণ আফ্রিকার সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে দেশটি নিরপেক্ষতার নীতি দেখালেও বাস্তবে কিউবা বা রাশিয়ার মতো পশ্চিমবিরোধী দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক জোশুয়া মেসারভির মতে, নিরপেক্ষতার নীতি প্রায়ই পশ্চিমবিরোধী অবস্থান আড়াল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ব্যবসায়িক সম্মেলনে বোজেলও দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু দেশের সঙ্গে বাড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা মূলত ইরানের দিকেই ইঙ্গিত করে।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে তিনি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তবে তার মন্তব্যের মূল অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক প্রিয়াল সিংয়ের মতে, যদি মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার অবস্থানে অনড় থাকেন, তাহলে আগামী কয়েক বছর দুই দেশের সম্পর্ক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















