মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় ক্ষতি হলেও তেহরান এখনো পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। কেউ মনে করছেন ইরানের পতন এখন সময়ের ব্যাপার, আবার কেউ বলছেন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও ধীরে ধীরে ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধের দিকে যেতে পারে।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের লক্ষ্য ও সময়সীমা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যুদ্ধের সূচনা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন বলে জানানো হয়। পরবর্তী কয়েক দিনে ধারাবাহিক আকাশ হামলায় ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতাও ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলাগুলোতে এখন পর্যন্ত এক হাজার তিনশর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শাজারাহ তাইয়্যেবা নামের একটি মেয়েদের স্কুলে আঘাত হানে। এতে অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করেছে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন অন্তত আরও একশ দিন যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সংঘাত সেপ্টেম্বর পর্যন্তও গড়াতে পারে।

ইরানের পতন আসন্ন?
রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সের্গেই বালমাসভের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ইরানের সরকার ও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তার ধারণা, অল্প সময়ের মধ্যেই তেহরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হবে।
তিনি মনে করেন, ইরানের সামরিক শক্তির বড় অংশ, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বালমাসভের মতে, ইরানের আঞ্চলিক কোনো শক্তিশালী মিত্র নেই, তাই সরাসরি যুদ্ধে অন্য কেউ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কম।
তবে তিনি এটাও বলেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবুও ট্রাম্প পিছু হটবেন না। কারণ আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি একটি স্পষ্ট বিজয়ের বার্তা ঘরে ফিরিয়ে নিতে চান।

লক্ষ্য পূরণ নাকি শাসন পরিবর্তন?
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ম্যাথিউ ক্রোনিগ মনে করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক শক্তি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে গুরুতরভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে তার মতে মূল প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য অর্জনের পর ট্রাম্প কি এটিকেই বিজয় ঘোষণা করবেন, নাকি ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যেও এগোবেন। দ্বিতীয়টি বাস্তবায়ন করা অনেক বেশি কঠিন এবং এর সফলতা নিশ্চিত নয়।
ইরান দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায় না
স্কোক্রফট মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা উদ্যোগের ইরান কৌশল প্রকল্পের পরিচালক নেট সোয়ানসনের মতে, ইরানের নেতৃত্ব এই সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তাই দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার কোনো আগ্রহ তাদের নেই।
তার মতে, ওয়াশিংটনের কিছু নীতিনির্ধারকের ধারণা যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল চাইলে ইরান যুদ্ধ থামিয়ে দেবে, সেটি ভুল হতে পারে।
সোয়ানসন বলেন, ইরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধবিরতি মানে কেবল সাময়িক বিরতি। কারণ তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল পুনরায় সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আবারও হামলা চালাতে পারে।
তিনি মনে করেন, তেহরান ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধের পথে যেতে পারে, যেখানে প্রতিপক্ষের তুলনায় বেশি চাপ সহ্য করার কৌশল তারা গ্রহণ করবে। তবে কোনো সমঝোতায় যেতে হলে ইরান নিশ্চিত হতে চাইবে যে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকারের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করবে, এমনকি ইসরায়েল এতে একমত না হলেও।
তেহরান কি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায়?
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক ভিন্ন মত দিচ্ছেন। স্কোক্রফট সেন্টারের অ্যান্ড্রু এল পিক মনে করেন, ইরান আসলে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করতে চাইবে এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে আগ্রহী হবে।
কয়েক সপ্তাহেই শেষ হতে পারে যুদ্ধ
রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মালেক দুদাকভ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে। কারণ ট্রাম্প দেশের ভেতর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন।
তার মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প এই সামরিক অভিযান শুরু করেছেন। আইনি কাঠামো অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের হাতে সাধারণত এক মাসের মতো সময় থাকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বড় একটি অংশ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে না। এমনকি ট্রাম্পের সমর্থক শিবিরের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এর সঙ্গে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দুদাকভ সতর্ক করে বলেন, যদি ট্রাম্প এই সীমার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেন, তবে এর রাজনৈতিক পরিণতি তার জন্য গুরুতর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















