মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বজুড়ে মিত্র দেশগুলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা হলে পাল্টা প্রতিশোধ আরও কঠোর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সংঘাতের তৃতীয় সপ্তাহে উত্তেজনার নতুন ধাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এখন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় খার্গ দ্বীপের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে সেখানে আরও কয়েক দফা হামলা চালানো হতে পারে।
খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এই দ্বীপে আঘাত বিশ্ব তেলবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখান থেকেই বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ হয়।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখতে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, যেসব দেশ এই প্রণালী দিয়ে তেল আমদানি করে, তাদেরই নিরাপত্তা রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনসহ যেসব দেশের কাছে এই আহ্বান জানানো হয়েছে, তাদের কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দেয়নি।

ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু এবং মধ্যপ্রাচলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সামরিক ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের শিল্প এলাকায় নিহত শ্রমিকদের প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা শুরু হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলের আকাশে উড়ে আসা অন্তত দশটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইরান দাবি করেছে, ওই হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

তেলবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে
সংঘাতের কারণে বিশ্ব তেলবাজারে অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দ্রুত কাটবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের সংখ্যা বাড়ছে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরানের নাগরিক।
ইরানের ইসফাহান শহরের একটি কারখানায় বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এতে সংঘাতের মানবিক মূল্য আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
কূটনৈতিক সমাধান এখনো দূরে
যুদ্ধ থামাতে এখনো কার্যকর কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি দেখা যায়নি। ট্রাম্প বলেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত শর্তগুলো সন্তোষজনক নয়।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















