পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। দুই দেশের বিরোধ যেন শক্তি প্রয়োগের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়—এমন আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতে আরও শক্তি প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে এবং উত্তেজনা বাড়বে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও চীনের বার্তা
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে এক ফোনালাপে ওয়াং ই দুই দেশের চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যে কোনো বিরোধ শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
ওয়াং ই দুই দেশকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানান এবং যত দ্রুত সম্ভব মুখোমুখি বৈঠকে বসার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, শক্তি প্রয়োগের পথ অব্যাহত থাকলে তা কেবল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

কান্দাহারে হামলার পর নতুন উত্তেজনা
চীনের এই বিবৃতি আসে এমন এক সময়, যখন পাকিস্তান আফগানিস্তানের কান্দাহার বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ডিপোতে বিমান হামলা চালায়। মার্চের ১২ থেকে ১৩ তারিখ রাতের মধ্যে চালানো এই হামলার ফলে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ওই স্থানে সংরক্ষিত তেলভাণ্ডার ধ্বংস করেছে, যা আফগান তালেবান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রমে ব্যবহার করছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযান ‘গজব লিল হক’ নামে পরিচালিত হচ্ছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
সীমান্তে সন্ত্রাস ও সামরিক অভিযান
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বেড়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে ইসলামাবাদ। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে এসব হামলার ঘটনা বেশি ঘটছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পাকিস্তান ‘গজব লিল হক’ নামের সামরিক অভিযান শুরু করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই অভিযানে সীমান্ত এলাকায় এবং আফগানিস্তানের ভেতরে চালানো হামলায় শত শত আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
এর আগে পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি একাধিক জঙ্গি ঘাঁটিতেও হামলা চালায়। নানগারহার, পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশে পরিচালিত বিমান হামলায় বহু জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছে নিরাপত্তা সূত্র।

অতীতের সীমান্ত সংঘর্ষ
দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আফগান তালেবান ও সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার পর পাকিস্তান সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সংঘর্ষে দুই পক্ষের বহু যোদ্ধা নিহত হয় এবং পাকিস্তানেরও বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য প্রাণ হারান।
যদিও এর পর দুই দেশের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে, তবুও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা
ফোনালাপে ওয়াং ই ও আমির খান মুত্তাকি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চীন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে আগ্রহী বেইজিং।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















