যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গাড়ি সংস্কৃতি ‘লোরাইডার’ এবার উঠে এল ডাকটিকিটে। দীর্ঘদিন ধরে মেক্সিকান-আমেরিকান ও চিকানো সম্প্রদায়ের সৃজনশীল শিল্পধারার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই বিশেষ ধরনের গাড়ি সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে নতুন ডাকটিকিট সিরিজ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডাকটিকিট উন্মোচন করা হয়েছে।
প্রান্তিক সংস্কৃতি থেকে মূলধারায়
লোরাইডার সংস্কৃতির সূচনা হয় ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে। ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো ও টেক্সাসের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ গাড়িকে পরিবর্তন করে শিল্পসম্মত ও অনন্য রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই এর বিকাশ ঘটে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু গাড়ির নকশা নয়, বরং সৃজনশীলতা, দক্ষতা, আত্মপরিচয় ও গর্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
লোরাইডার গাড়িগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো ঝলমলে রঙের পেইন্ট, চকচকে ক্রোম, বিলাসবহুল অভ্যন্তর এবং হাইড্রোলিক প্রযুক্তি, যার সাহায্যে গাড়ি ওঠানামা করতে পারে বা লাফ দিতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যই তাদের অন্য সব গাড়ি থেকে আলাদা করে।
পাঁচটি আইকনিক গাড়ি নিয়ে ডাকটিকিট
এই বিশেষ ডাকটিকিট সিরিজটি ডিজাইন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের আর্ট ডিরেক্টর আন্তোনিও আলকালা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লোরাইডার সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। অসংখ্য ছবি ঘেঁটে তিনি শেষ পর্যন্ত পাঁচটি গাড়ি বেছে নেন।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৪৬ সালের শেভি ফ্লিটলাইন, তিনটি ক্লাসিক শেভি ইমপালা এবং ১৯৮৭ সালের ওল্ডসমোবাইল কাটলাস সুপ্রিম। প্রতিটি গাড়ির নকশা ও রঙের ভিন্নতা লোরাইডার সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছে।
আলকালা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডাকটিকিট সাধারণত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি ও অর্জনের প্রতীক হয়ে থাকে। তাই লোরাইডার সংস্কৃতিকে ডাকটিকিটে তুলে ধরা একটি বড় স্বীকৃতি।

শিল্পের সূক্ষ্ম স্পর্শ
এই ডাকটিকিটে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘পিনস্ট্রাইপিং’ নামে পরিচিত সূক্ষ্ম নকশা। এই কাজ করেছেন শিল্পী ড্যানি আলভারাডো, যিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে এই শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছেন। গাড়ির উপর সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়ে তৈরি জটিল নকশা লোরাইডার শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আলভারাডোর কাছে এই প্রকল্পের বিশেষ আবেগও রয়েছে। কারণ তাঁর বাবা দুই দশকের বেশি সময় ডাকবাহক হিসেবে কাজ করেছিলেন।
নিষেধাজ্ঞা থেকে স্বীকৃতি
একসময় লোরাইডার সংস্কৃতিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে গাড়ি নিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে লোরাইডার সংস্কৃতিকে গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হতো।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। ক্যালিফোর্নিয়া ২০২৪ সালে এই ধরনের ‘ক্রুজিং নিষেধাজ্ঞা’ বাতিল করেছে। নিউ মেক্সিকোতেও সম্প্রতি ‘লোরাইডার দিবস’ উদযাপন করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংস্কৃতি
আজ লোরাইডার সংস্কৃতি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডন, হাঙ্গেরি, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানেও এখন লোরাইডার কার ক্লাব দেখা যায়।
এই সংস্কৃতির অন্যতম আলোকচিত্রী হুমবেরতো ‘বেতো’ মেন্দোজার তোলা ছবি এই ডাকটিকিটের তিনটিতে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লোরাইডার সম্প্রদায় নিজেদের অবহেলিত মনে করত। ডাকটিকিটে এই স্বীকৃতি তাদের কাছে ঐতিহাসিক।
তার ভাষায়, “এটি শুধু একটি ডাকটিকিট নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার প্রতীক।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















