সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন ভোক্তারা। পদে পদে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা।বাজারে জোরালো মনিটরিং না থাকায় ঠকছেন ক্রেতা। অথচ সরকার নির্বিকার দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, কোনোভাবেই তাদের দমানো যাচ্ছে না। নানা অজুহাতে কারসাজির মাধ্যমে তারা একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অজুহাতে এবং সামনে ঈদকে পুঁজি করে ভোজ্যতেল নিয়ে কারসাজি। এবারও অতীতের মতো মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট তৈরি করেছে তারা। বিশেষ করে বাজার থেকে পাঁচ লিটারের বোতল উধাও হয়ে গেছে। ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে লিটারপ্রতি দাম ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে ভোজ্যতেলের। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোজ্যতেল মজুত আছে। দাম একফোঁটাও বাড়ার সম্ভাবনা নেই।’ অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দাম না বাড়ানো পর্যন্ত ভোজ্যতেল উৎপাদক কোম্পানিগুলো বাজারে সরবরাহ বাড়াবে না। অতীতেও তারা এই পদ্ধতিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধি করেছে।
এবার রোজার আগে সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে খেজুর। রমজান শুরুর পর আরও এক দফা বাড়ানো হয়েছে খেজুরের দাম।মানভেদে খেজুরের দাম কেজিতে ২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শুল্ক হ্রাসের পর খেজুরের দাম কমার কথা ছিল; কিন্তু উল্টো দাম বেড়েছে। ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে গত বছরের মতো এবারও শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবুও খুচরা বাজারে দাম কমেনি; বরং বেশির ভাগ জনপ্রিয় খেজুরের দামই বেড়েছে।
এসব খেজুরের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানি করেছে ২৫টি প্রতিষ্ঠান। ফলে দেশে খেজুরের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন মাত্র দুই ডজন ব্যবসায়ী।তাদের হাতেই জিম্মি ভোক্তারা। ফলে শুল্ক কমানোর সুফলও ভোক্তারা পাননি।
এ ছাড়া বর্তমানে বাজারে চলছে সিন্ডিকেটের কারসাজি এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের ক্ষেত্রে। বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা করছে না তারা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিটি সিলিন্ডার প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে।
এই সিন্ডিকেট সময়ে-সময়ে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কারসাজি করে। এই কারসাজি করার জন্য তারা সব সময় দেশীয় বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বেছে নেয়।রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের বাজার যে তেতে উঠেছে, তা এখনও চলমান। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সব নিত্যপণ্যের দাম কমে গেলেও বাংলাদেশের মানুষ তার সুফল পাননি।

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কারসাজি করে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকায় এবং কাঁচা মরিচের দাম হাজার টাকায় নিয়ে যায় এই সিন্ডিকেট।ওই সময়ে শতচেষ্টা করেও পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীরা সরকারকে সহযোগিতা করেননি; বরং তাঁরা পণ্য হাতবদলের মাধ্যমে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছিলেন।
একইভাবে ২০২৩ সালে ডিম নিয়ে কারসাজি করে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল। বাজারে হালি ডিমের দাম ৫২ টাকায় গিয়ে ওঠে।ভোক্তার পকেট কেটে অতি মুনাফা করার প্রমাণ পাওয়ায় তখন বড় ছয় কোম্পানি ও চার বাণিজ্যিক অ্যাসোসিয়েশনের (সমিতি) বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ডিমের বাজারে অস্থিরতার কারণে সিপি, প্যারাগন, কাজী, ডায়মন্ড এগ ও তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আমানত উল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।
সিন্ডিকেটের এমন কারসাজির ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে; কিন্তু সিন্ডিকেট কিছুতেই ভাঙছে না বন্ধ হচ্ছে না কারসাজি; বরং এই সিন্ডিকেট কৌশলগত মজুতদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের জিম্মি করছে, যা বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলেছে। ফলে দেশের সাধারণ ভোক্তাশ্রেণি এই সিন্ডিকেটের চাপায় পিষ্ট হচ্ছে।
মূলত মোটাদাগে বাংলাদেশের সমস্যা হলো, হতে গোনা সাত থেকে আটটি বড় করপোরেট কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।এই কোম্পানিগুলোই আমদানিকারক আবার তারাই উৎপাদক। এসব কোম্পানির সিন্ডিকেট বা কারসাজির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন সুয়োমটো মামলাও করেছে; কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং এসব কোম্পানি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হলেও পণ্য এবং সব ধরনের সেবার দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের আয় কমে গেলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে একটি চক্র। তারা প্রতিবছর ভোক্তাকে জিম্মি করে হাজার কোটি টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে; কিন্তু ওই চক্রের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। সরকারি দুএকটি সংস্থা কোনো কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নামমাত্র জরিমানা করছে। এতে জরিমানার অর্থ তুলতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছেÑ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট কি বেশি শক্তিশালীÑ এমন প্রশ্নও উঠছে।
বড় ব্যবায়ীরাই সিন্ডিকেটে
দেশের জন্য জরুরি নিত্যপণ্যের আমদানি এখন প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা কয়েকটি গোষ্ঠী।মুক্তবাজারের নিয়ম অনুযায়ী পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে তারা একে অন্যের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে পণ্য আমদানির প্রতিটি পর্যায়ে তাদের কর্তৃত্ব তৈরি করেছে। এর ফলে বাজারের ওপর একক ‘কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা’ হয়েছে তাদের, যার জের ধরে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ভোক্তারা।
আবার ডলারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপদে পড়েছেন ছোট আমদানিকারকদের অনেকে।ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের এসব আমদানিকারকের অনেকেই এখন ডলার-সংকট আর কথিত সিন্ডিকেট চক্রের সম্মিলিত ‘আগ্রাসনে’ টিকতে না পেরে সরে দাঁড়াচ্ছেন দীর্ঘদিনের আমদানি বাণিজ্য থেকে।আবার সরে গিয়েও এসব বিষয়ে তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন, যদি এ কারণে তাদের অন্য ব্যবসাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়!
চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর ভাষায়, ‘এখানে বড়রা সব একজোট আমরা ছোটরাও এই বড়দের কাছ থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পণ্য নিতে পারি না; বরং তারাই আমাদের ঠিক করে দেয় কোন পণ্য আমরা কার কাছ থেকে কত দরে কিনব। এভাবেই কয়েকজন মিলে সব করায়ত্ত করেছে।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ২০২৩ সালের জুনে জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গে মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মখে পড়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে তাতে হঠাৎ ক্রাইসিসটা তৈরি হবে। এ জন্য আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্য থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি।’
২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর ওই সররকারের কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের আলু নিয়ে এই সিন্ডিকেট-সংক্রান্ত এক বক্তব্য খবরের কাগজে শিরোনাম হয়েছিল কোল্ড স্টোরেজগুলো কারসাজির করে আলুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর আক্ষেপ করে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সিন্ডিকেট করে আলুর কোল্ড স্টোরেজগুলো সাধারণ মানুষের টাকা শুষে নিয়েছে। আমরা অসহায় হয়ে দেখেছি, কিছু করতে পারিনি। আমরা বেশি চাপ দিলে তারা বাজার থেকে আলু তুলে নিয়ে যায়।’ কৃষিমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘আলুতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। আলুতে আমাদের ঘাটতি নেই। গত বছর আলুতে কৃষক দাম পাননি, তাই এ বছর তারা বেশি আলু চাষ করেননি। সে সুযোগে এ বছর সিন্ডিকেট করে একটা অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে আমাদের মাঝেমধ্যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।’
বাংলাদেশে অনেক সময় কোনো ভোগ্যপণ্যের দাম অতিমাত্রায় বাড়লে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে।ক্ষেত্রবিশেষে একটি দাম নির্ধারণ করে দেয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বাজারে সেটিও কার্যকর হয় না।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সিন্ডিকেট
বাংলাদেশে চিনি, ডাল, তেলসহ ১৭টি পণ্যকে নিত্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।এসব মূল পণ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলোর মার্কেট শেয়ার বড় কয়েকজন আমদানিকারকদের হাতে। আর বাংলাদেশের এই আমদানির ব্যবসা প্রধানত চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। কারণ, বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। ফলে বড় ব্যবসায়ীরা এই চট্টগ্রাম থেকে তাদের কারসাজি বা সিন্ডিকেট পরিচালনা করে থাকেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এই বড় ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে ব্যবসা ভাগাভাগি করছে। ফলে বাজার থেকে ছোটো ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেছে তাদের অবাধ্য হয়ে কোনো ব্যবসাই কেউ করতে পারে না। এখানে সিন্ডিকেটের বাইরে কিছু কল্পনাও করা যায় না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বড় আকারে বা বিপুল পরিমাণে পণ্য আমদানি করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একজোট হয়েছে। ফলে এখন আর মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ওই বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য কিনতে পারেন না যদি একজন উদ্যোক্তা ভাবেন যে, তিনি ১০০ কোটি টাকার চিনি বা লবণ কিনবেন। সে জন্য বড় ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে তারাই ঠিক করে দেন, কোন পণ্য কত দামে কার কাছ থেকে কিনতে হবে। এতে রাজি না হয়ে উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, তিনি ব্রাজিল থেকে ১০০ কোটি টাকার চিনি আনবেন, সে অনুযায়ী তিনি আমদানি করলেও বড় গোষ্ঠীগুলো ‘তার আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে বাজারে চিনি ছেড়ে দিয়ে’ তাকে লোকসানের মুখে ফেলে দেবে।
আবার বড় চক্রের বাইরে থেকে কেউ আমদানি করতে এলসি খুলতে চাইলেও ব্যাংক রাজি হবে না। এমনকি বাধা আসবে কাস্টমস-ভ্যাটসহ নানা দফতর থেকে।আর ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে বা তাদের সিগন্যাল ছাড়া কোনো পণ্য আনলে সেগুলো বন্দরে আনার জন্য লাইটার ভেসেল পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এমনকি শ্রমিক গোষ্ঠীও এসব পণ্য খালাসে কাজ করতে আগ্রহী হয় না। ফলে অন্যদের আমদানি করা পণ্য কত দিন সাগরে বা জাহাজে পড়ে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। আবার খালাস হলেও কাস্টমস ও কর বিভাগ ছাড়পত্র দেবে কি না, তা নিয়েও সংশয় থাকে।
এভাবে প্রতিটি পদে পদে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সিন্ডিকেট। টাকা থাকলেও এদের সাথে কেউ পেরে উঠবে না।এমনকি সরকার একটু দাম নির্ধারণ করে দিলে তারা পণ্য হয়তো জাহাজেই রেখে দেবে কিছুদিন, যাতে সংকট সৃষ্টি হয়, তখন সরকারই চাপ দেবে যে দাম যা-ই হোক, পণ্য আনুন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত সিন্ডিকেট বলতে যাদের বোঝানো হয়, তারা একদিকে যেমন বড় আমদানিকারক, আবার নানাভাবে ব্যাংকগুলোর মালিকনা বা ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্বেও আছেন তারাই। ফলে কারও কাছে যতই টাকা থাকুক, এদের বাইরে গিয়ে কেউ পণ্য আনার জন্য কোনো ব্যাংকে এলসিই খুলতে পারবেন না। কারণ, ব্যাংকও তাদের।
আবার সাগরের বড় জাহাজ থেকে বন্দরে খালাসের জন্য ব্যবহৃত লাইটার জাহাজগুলোও তাদের কিংবা তাদের সহযোগীদের ফলে শ্রমিকেরাও মালিকদের বাইরে গিয়ে অন্য কারও জন্য কাজ করতে পারেন না বিপদে পড়ার ভয়ে। সবকিছুই এই সিন্ডিকেটের হওয়ায় সরকারের রাজস্ব বিভাগের লোকজনও থাকেন চাপের মুখে।
আবার কথিত সিন্ডিকেট কোনো পণ্য এনে যাদের মাধ্যমে বাজারজাত করবে, সেসব প্রতিষ্ঠানও নামে-বেনামে তাদের পরিবারের লোকজনেরই এমনকি বড় বড় বাজারগুলোর জন্য এসব পণ্যের ডিলারশিপও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজনের হাতে।
বাজারে কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন বন্ধ করে ভোক্তাদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রতিযোগিতা কমিশন কমিশন বলছে, কারসাজির এই চিত্র তাদেরও জানা। এই কারসাজির জন্য কথিত বড় কয়েকটি গোষ্ঠীর কার্যক্রমের বিষয়ে কয়েকটি সুয়োমটো মামলাও করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬০-৭০টি মামলা হয়েছে এই কথিত সিন্ডিকেটের লোকজনের বিরুদ্ধে। এগুলো শুনানি পর্যায়ে ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেগুলো থামকে আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, কয়েক বছর ধরেই আমদানির ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি জরুরি পণ্যের মার্কেট শেয়ার এখন কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের বলয় তৈরি করে নিজেদের শর্তে বাজারে পণ্য দিচ্ছে তারা। তাদের কথামতো না হলে অন্যরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ধীরে ধীরে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বড়রা ধীরে ধীরে পুরো সাপ্লাই চেনটা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন আমদানি থেকে খুচরা পর্যন্ত তারা নিজেদের বলয় তৈরি করেছে। তাদের শর্ত মতোই সব হচ্ছে। তাদের কথামতো না হলে অন্যরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। যেকোনো পরিবেশেই হোক ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক।’
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, এই গোষ্ঠীগুলো শুধু পণ্য আমদানিই নয়, জাহাজ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।সরকারের সঙ্গে দাম নিয়ে আলোচনা হলে বাজেটে শুল্ক হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয় থাকলে, অথবা সরকার দাম কমানোর বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে, সে সময় হয়তো তারা জাহাজ সাগরেই রেখে দেবে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভোক্তারা ও ঝুঁকিতে থাকবে বাজার ব্যবস্থাপনা। বাজারের মূল্যবোধ, ভ্যালুজ, সংস্কৃতিÑ সবই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।

বাজার অর্থনীতি কী বলছে?
বাজার অর্থনীতির ভিত্তি হলো প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও তথ্যের সমান প্রবাহ। অ্যাডাম স্মিথের ‘অদৃশ্য হাত’ তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক ক্রিয়ায় বাজারে স্বাভাবিকভাবে ন্যায্য দাম নির্ধারিত হওয়ার কথা; কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন।এখানে বাজার অনেক সময় অল্প কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর অদৃশ্য সমঝোতায় পরিচালিত হয়, যারা কার্যত পণ্যের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এই আইনবিরোধী ব্যবস্থাই সিন্ডিকেট, যা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে একধরনের নীরব স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। ফলে এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও সুশাসনের ঘাটতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
অর্থনীতির পরিভাষায় সিন্ডিকেট মূলত অলিগোপলিস্টিক মার্কেট স্ট্রাকচারের একটি বিকৃত রূপ। অলিগোপলি বাজারে বিক্রেতার সংখ্যা থাকে সীমিত, যারা একে অপরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে দাম নির্ধারণে প্রভাব ফেলে বাংলাদেশে মোট আমদানির প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে হাতেগোনা পাঁচ-ছয়টি বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ। যখন বাজার এমনভাবে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন সুস্থ প্রতিযোগিতা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। গেম থিওরির ভাষায় একে বলা হয়, কো-অপারেটিভ সিন্ডিকেট। যেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি করে ফেলে। এর ফলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে প্রাইস ফিক্সিং বা কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে।
অর্থনীতির এঙ্গেলস অনুযায়ী, আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হলে জীবনমান নিম্নমুখী হয়। বাস্তবেও তা-ই ঘটছে, গত পাঁচ বছরে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় প্রবণতা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে, যার পেছনে সিন্ডিকেট-সৃষ্ট উচ্চমূল্যই প্রধান কারণ বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো কৃষক ন্যায্য দাম পান না, অথচ ভোক্তা কেনেন চড়া দামে। উৎপাদন মৌসুমে কৃষক অনেক সময় উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। কিন্তু শহরের বাজারে একই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এই ব্যবধান সৃষ্টি করে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, আড়তদার এবং ট্রাক সিন্ডিকেট। অনেক সময় মহাসড়কে অতিরিক্ত চাঁদা এবং লজিস্টিক অব্যবস্থাপনার কারণে পণ্যের মূল দামের চেয়ে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে যায়। ভোক্তা যে দামে পণ্য ক্রয় করেন, তার অর্ধেকও কৃষক পান না। এই যে মাঝখানের বিশাল গ্যাপ, এর সিংহভাগই সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়। ফলে উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ কমে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট তৈরি করে। বাজার সিন্ডিকেটের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের বড় কারণ হলো লাগামহীন পরিবহন ব্যয় ও পদ্ধতিগত চাঁদাবাজি। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা আসতে এক ট্রাক পণ্যের পথে ১০-১২টি পয়েন্টে অবৈধ চাঁদা দিতে হয়। পণ্যের দামের সঙ্গে এটি সরাসরি যোগ হয়।
নিত্যপণ্যের চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা অত্যন্ত কম হওয়ায় সিন্ডিকেট এই গাণিতিক সূত্রকে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ মুনাফা লুটে নেয়। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার শুল্ক কমালেও ভোক্তা তার সুফল পান না। কারণ, ওই শুল্কছাড়ের সুবিধা ব্যবসায়ীদের মুনাফার মার্জিনে যোগ হয়ে যায়। আর এই সিন্ডিকেটের চাপে ভোক্তার ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হলেও মূল কারসাজিকারীদের অর্থাৎ বড় আমদানিকারক বা মিলমালিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। প্রতিযোগিতা কমিশনের কাছে বাজার কারসাজি প্রমাণ করার মতো আধুনিক তথ্যপ্রবাহ ও ফরেনসিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে বড় সিন্ডিকেটগুলো আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। শক্তিশালী আইনি প্রয়োগ এবং বড় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সিন্ডিকেট প্রথাটি আরও প্রসারিত হয়েছে।

সরকারের করণীয়
সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল হওয়ায় সাধারণ ভোক্তা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ‘বেসিক নিডস’ বা মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করছেন, যা ভোক্তা অধিকারের পরিপন্থী। সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, টেলিকম খাতের মতো নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও ‘ডমিন্যান্ট মার্কেট প্লেয়ার’দের তালিকা প্রকাশকরা উচিত। তারা কোন পণ্য কী দামে কতটুকু আনছে, কত দামে বিক্রি করছে, কতটা কোথায় মজুদ আছে, এগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য থাকা দরকার। এসব পণ্যের ব্যবসায়ীদের রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালু করে ব্যাংক লেনদেনের আওতায় এনে প্রতিটি লেনদেনের অনলাইন আপডেট হওয়া উচিত।
গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা তৈরি করা না গেলে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা না থাকলে ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আবার দেশে যারা উৎপাদন করেন, তারাও বিপদে পড়বেন।
অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, সিন্ডিকেট মূলত বাজারে প্রবেশের অন্তরায় তৈরি করে, যা নতুনদের বাজারে আসতে বাধা দেয় বাজার সিন্ডিকেট রুখতে সাময়িক অভিযানের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমদানি করা পণ্যের এলসি থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে, যেন পণ্য মজুত বা কৃত্রিম সংকট দ্রুত শনাক্ত করা যায় দ্বিতীয়ত, আমদানিতে গুটিকয়েক গ্রুপের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য ব্যাংকঋণ ও এলসি-সুবিধা সহজ করে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে যেন তারা বড় করপোরেটগুলোর কারসাজির বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ছাড়া টিসিবির গুদামজাতকরণ সক্ষমতা বাড়িয়ে, পর্যাপ্ত ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি বিইআরসি নির্ধারিত দামে জ্বালানি ও গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, এলাকাভিত্তিক সমবায় বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটি সরাসরি কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে পারে।
অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান রক্ষার জন্য সিন্ডিকেটমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি সময়ের অনিবার্য দাবি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়া এই লড়াইয়ে জয়লাভ অসম্ভব।
আকিব রহমান 



















