ব্রাজিলের কামাসারি শহরের এক নিরিবিলি রাস্তা হঠাৎই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডির নতুন কারখানা নির্মাণে কাজ করতে আসা চীনা শ্রমিকদের নিয়ে তদন্তে উঠে আসে এমন সব তথ্য, যা ব্রাজিলের শ্রম কর্তৃপক্ষকে বলাতে বাধ্য করেছে—শ্রমিকদের অনেককে ‘দাসত্বসদৃশ’ পরিস্থিতিতে কাজ করানো হয়েছে।
বড় স্বপ্নের কারখানা, অন্ধকার বাস্তবতা
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কামাসারির কলোরাডো রোডে একসঙ্গে বহু চীনা শ্রমিক এসে থাকতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ড্যানিয়েলা দে অলিভেইরা প্রথমে ভেবেছিলেন তারা অস্থায়ীভাবে এসেছে। কিন্তু দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, প্রায় ৫৬ জন শ্রমিক ছোট দুটি ভবনে গাদাগাদি করে থাকছেন।
শ্রমিকরা প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। সপ্তাহের সাত দিনই কাজ চলত। অবসর, বিনোদন বা বিশ্রামের কোনো সুযোগ ছিল না। তারা কাজ করছিলেন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা নির্মাণে, যা তৈরি করছিল চীনের বড় গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি।

চীনের বিস্তার ও দক্ষিণ আমেরিকার নতুন বাস্তবতা
ব্রাজিলে এই প্রকল্প কেবল একটি শিল্প বিনিয়োগ নয়; এটি দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা প্রভাবের প্রতীক। গত দুই দশকে চীন এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছে। ২০০০ সালে যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
পেরুর চানকাই বন্দরের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প, কলম্বিয়ার মেট্রো নির্মাণ কিংবা আমাজন অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—সবখানেই চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে। একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও বিওয়াইডি বিশ্বব্যাপী বিক্রিতে টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই বিস্তারের মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
হঠাৎ অভিযান, চমকে ওঠেন তদন্তকারীরা
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় ব্রাজিলের সরকারি তদন্তকারীরা কলোরাডো রোডের শ্রমিকদের আবাসস্থলে অভিযান চালান। সেখানে গিয়ে তারা যা দেখেন, তা তাদের বিস্মিত করে।

অনেক শ্রমিক মেঝেতে ঘুমাচ্ছিলেন, অনেকের কাছে গদি ছিল না। আবর্জনা ছড়িয়ে ছিল সর্বত্র। খাবার মেঝেতে রাখা। একটি ভবনে ৩১ জন শ্রমিক একটি মাত্র বাথরুম ব্যবহার করতেন।
তদন্তকারীরা বলেন, এটি শুধু শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়—বরং পরিস্থিতি ছিল দাসত্বসদৃশ।
তদন্তে উঠে আসে অভিযোগ
ব্রাজিলের পাবলিক লেবার মন্ত্রণালয় পরে অভিযোগ করে যে বিওয়াইডি ব্রাজিল এবং তাদের চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না জিনজিয়াং কনস্ট্রাকশন ও টেকমোন্টা শ্রমিকদের দেশে এনে প্রতারণার মাধ্যমে কঠোর শ্রমে বাধ্য করেছে।
তদন্ত অনুযায়ী, প্রায় ২২০ জন শ্রমিককে উচ্চ বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু অনেকের পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রতিশ্রুত বেতনের বড় অংশ আটকে রাখা হয়। রাতে তাদের আবাসস্থলে তালাবদ্ধ রাখা হতো বলেও অভিযোগ ওঠে।
সরকারি মামলায় ৪৯ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।

কোম্পানিগুলোর অস্বীকার
বিওয়াইডি ও সংশ্লিষ্ট চীনা ঠিকাদাররা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, সাংস্কৃতিক ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল অনুবাদের কারণে পরিস্থিতি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিওয়াইডির জনসংযোগ পরিচালক লি ইউনফেই সামাজিক মাধ্যমে বলেন, কিছু বাহ্যিক শক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে চীনা ব্র্যান্ড ও চীন-ব্রাজিল সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
পরে এক সমঝোতায় প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৭.৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়, যার অর্ধেক শ্রমিকদের এবং বাকি অংশ শ্রম মন্ত্রণালয়ের তহবিলে যাবে। তবে এতে কোনো দোষ স্বীকার করতে হয়নি।
ফোর্ডের বিদায়, বিওয়াইডির আগমন
এই কারখানার ইতিহাস শুরু হয় ফোর্ডের বিদায়ের মধ্য দিয়ে। ২০২১ সালে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মহামারির কারণে ফোর্ড কামাসারির কারখানা বন্ধ করে দেয়। এতে শহরে বড় অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারান।

এরপর স্থানীয় নেতারা নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজতে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে যান। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে বিওয়াইডি ৬২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সেই কারখানার জায়গায় নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রকল্প শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিদেশি শ্রমিকের আগমন
বিওয়াইডি প্রথমে স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগের কথা বললেও পরে তারা চীনা নির্মাণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে শত শত চীনা শ্রমিক নিয়ে আসে।
এই শ্রমিকদের অনেকেই চীনের দরিদ্র অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। তাদের মাসে প্রায় ২৮০০ ডলার আয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যা দেশে তাদের সম্ভাব্য আয়ের চেয়ে অনেক বেশি।
কিন্তু ব্রাজিলে এসে অনেকেই নিজেদের আটকে পড়া অবস্থায় দেখতে পান।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও দুর্ঘটনা
ব্রাজিলিয়ান শ্রমিকদের মতে, চীনা শ্রমিকরা ভোর পাঁচটা থেকেই কাজ শুরু করতেন এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও কাজ চালিয়ে যেতেন। অনেক সময় তারা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই উচ্চতায় কাজ করতেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে এক শ্রমিকের হাত পিষে যায় এবং একটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়। আরেকজনের পা ভেঙে যায়। আরেকজন কাঠমিস্ত্রি করাতের দুর্ঘটনায় হাতের কার্যক্ষমতা হারান।
তদন্তের সূচনা
একটি অভিযোগ বার্তার ভিত্তিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত শুরু হয়। প্রথম অভিযানে কর্তৃপক্ষকে কারখানায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বড় দল নিয়ে তদন্ত চালিয়ে বহু শ্রম আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তদন্তে জানা যায়, শ্রমিকদের বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে ভিসা দেওয়া হলেও তারা বাস্তবে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন। অনেকের পাসপোর্ট কর্মস্থলের ড্রয়ারে রাখা ছিল এবং বেতনের বড় অংশ চীনে পাঠানো হতো।
শ্রমিকদের বক্তব্য
কিছু শ্রমিক তদন্তকারীদের বলেন, তারা সুযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে যেতে চান। অনেকেই বলেছিলেন, কাজ ছাড়া কোথাও যাওয়ার অনুমতি ছিল না।
কেউ কেউ জানান, খাবারও পর্যাপ্ত ছিল না এবং অনেক সময় ক্ষুধার্ত থাকতে হতো।

নতুন যুগের সূচনা, পুরোনো প্রশ্ন
তদন্তের পর শ্রমিকদের চীনে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু বিওয়াইডি প্রকল্প বন্ধ হয়নি। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ব্রাজিলে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করে এবং নতুন কারখানার উৎপাদনও শুরু হয়।
এক অনুষ্ঠানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এবং বিওয়াইডির প্রধান ওয়াং চুয়ানফু এই প্রকল্পকে দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক বলে উল্লেখ করেন।
তবে শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। কারখানায় ব্রাজিলিয়ান শ্রমিকদের মধ্যেও কাজের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কয়েক দিনের ধর্মঘটও হয়।
এক শ্রমিক প্রতিবাদের সময় বলেন, “আমরা পশু নই। আমাদের মানুষ হিসেবে আচরণ করা হোক।”
তবুও অনুষ্ঠানের মঞ্চে ভবিষ্যতের কথা বলা হচ্ছিল।
বিওয়াইডির প্রধান বলেন, “ভবিষ্যৎ বিদ্যুতচালিত। আর সেই ভবিষ্যৎ সবার।”

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















