ঘুমাতে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় জেগে থাকা বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া—অনেক মানুষের জন্যই এটি একটি সাধারণ সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে একটি সহজ মানসিক কৌশল সাহায্য করতে পারে। এর নাম ‘কগনিটিভ শাফলিং’। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্ককে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয় যাতে চিন্তার চাপ কমে এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সহজ হয়।
কগনিটিভ বিজ্ঞানী লুক বোদুয়াঁ প্রথম এই কৌশলটি তৈরি করেন। তিনি বলেন, ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মানুষের মস্তিষ্কে অনেক সময় ছোট ছোট স্বপ্ন বা বিচ্ছিন্ন চিত্রের মতো চিন্তা আসে। সেই প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করেই এই পদ্ধতির ধারণা তৈরি হয়েছে।
ঘুমের আগে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে
কানাডার সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কগনিটিভ বিজ্ঞানী লুক বোদুয়াঁ বলেন, যখন মানুষ ঘুমিয়ে পড়তে থাকে, তখন মস্তিষ্কে এলোমেলো ছোট ছোট দৃশ্য বা ছবির মতো চিন্তা তৈরি হয়। কেউ যদি সেই সময়ে জেগে ওঠে, তখন সে প্রায়ই বলে যে সে অদ্ভুত ছোট ছোট দৃশ্য বা স্বপ্নের মতো কিছু দেখছিল।
এই ধরনের চিন্তার প্রবাহকে অনুকরণ করেই বোদুয়াঁ তৈরি করেন ‘সিরিয়াল ডাইভার্স ইম্যাজিনিং টাস্ক’, যা সাধারণভাবে কগনিটিভ শাফলিং নামে পরিচিত। তিনি এটিকে তুলনা করেন মানসিক তাসের প্যাকেট এলোমেলোভাবে মেশানোর সঙ্গে—যেখানে প্রতিটি কার্ডে আলাদা ছবি বা ধারণা থাকে।
তিনি নিজে এই কৌশল ব্যবহার করে উপকার পেয়েছেন বলে জানান। গবেষণাতেও দেখা গেছে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এটি কার্যকর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কার্যকারিতা আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার।
কেন অনেকের ঘুমের সমস্যা হয়
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিষয়ক চিকিৎসক রাফায়েল পেলায়োর মতে, ঘুমের মধ্যে একটি স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। মানুষের শরীরের ঘুমের প্রয়োজন থাকলেও ঘুমের সময় মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি অসহায় অবস্থায় থাকে। তাই শরীর স্বাভাবিকভাবেই মাঝে মাঝে জেগে ওঠে।
তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন মানুষ পুরো রাত একটানা ঘুমায়। বাস্তবে তা নয়। সাধারণত প্রতি দেড় ঘণ্টা পরপর ঘুমের চক্র বদলায় এবং তখন স্বল্প সময়ের জন্য জেগে ওঠা স্বাভাবিক।

যাদের ঘুমের সমস্যা নেই, তারা সাধারণত এসব ক্ষণিক জেগে ওঠা মনে রাখে না। কিন্তু যারা উদ্বেগে ভোগেন, তাদের জন্য এই অবস্থায় আবার ঘুমে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কগনিটিভ শাফলিং কীভাবে করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝরাতে জেগে উঠে উদ্বেগ বা চিন্তায় ডুবে গেলে এই পদ্ধতি চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রথমে একটি সহজ শব্দ ভাবুন—যেমন ‘বাড়ি’। এরপর সেই শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে যত শব্দ সম্ভব মনে করার চেষ্টা করুন। উদাহরণ হিসেবে ঘোড়া, হারমোনিকা, মধু ইত্যাদি।
প্রতিটি শব্দ বা বস্তুকে ৫ থেকে ১৫ সেকেন্ডের জন্য কল্পনা করুন। চাইলে নিজেকে সেই দৃশ্যের ভেতরেও ভাবতে পারেন। যেমন আপনি ঘোড়ায় চড়ছেন, হারমোনিকা বাজাচ্ছেন বা মধু সংগ্রহ করছেন।
একটি শব্দ থেকে অন্যটির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক খোঁজার দরকার নেই। শুধু একের পর এক নতুন ছবি বা ধারণা মনে আনতে থাকুন। যদি একই অক্ষর দিয়ে আর কোনো শব্দ মনে না আসে, তাহলে শব্দের পরের অক্ষরে চলে যান এবং নতুন ছবি কল্পনা করুন।
এইভাবে শব্দের সব অক্ষর ব্যবহার করতে করতে অনেক সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে। যদি শব্দ শেষ হয়ে যায় এবং তখনও ঘুম না আসে, তাহলে নতুন একটি শব্দ নিয়ে আবার শুরু করা যায়।
এই পদ্ধতি কাজ করে কেন

এই কৌশলটি একদিকে ঘুমের আগের স্বাভাবিক চিন্তার ধরণকে অনুকরণ করে, অন্যদিকে মস্তিষ্ককে সামান্য ব্যস্ত রাখে। এর ফলে উদ্বেগ, পরিকল্পনা বা সমস্যার চিন্তা—যা প্রায়ই মানুষকে জাগিয়ে রাখে—তা বাধাগ্রস্ত হয়।
বোদুয়াঁ ও তার সহকর্মীরা ঘুমের সমস্যায় ভোগা কিছু মানুষকে নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একদলকে ঘুমের আগে সমস্যার কথা লিখে রাখার পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলা হয়, আর অন্য দল ব্যবহার করে কগনিটিভ শাফলিং।
গবেষণায় দেখা যায়, কগনিটিভ শাফলিং পদ্ধতিটি সমানভাবে কার্যকর ছিল। এর একটি বড় সুবিধা হলো—এটি সরাসরি ঘুমানোর সময় বা মাঝরাতে জেগে উঠলেও ব্যবহার করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস হপকিন্স স্লিপ ডিসঅর্ডারস সেন্টারের চিকিৎসা পরিচালক সারা বেঞ্জামিন বলেন, ঘুমের সমস্যা অনেক সময় জটিল হয় এবং সমাধান খুঁজতে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়।
তার মতে, কগনিটিভ শাফলিং একটি সহজ কৌশল, যার জন্য কোনো যন্ত্র বা ওষুধের দরকার নেই এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। তাই এটি অনেক রোগীর জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

রাফায়েল পেলায়ো বলেন, যারা বিছানায় শুয়ে বারবার একই চিন্তা নিয়ে ভাবতে থাকেন, তাদের জন্য এই কৌশলটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। এতে মন অন্যদিকে ব্যস্ত থাকে এবং উদ্বেগ কমে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিকে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা বলে মনে করেন। এ ধরনের থেরাপি মানুষের উদ্বেগ, অভ্যাস এবং চিন্তার ধরণ পরিবর্তনে সাহায্য করে।
কিছু ক্ষেত্রে আবার ঘুমের সমস্যার পেছনে অন্য স্বাস্থ্যগত কারণও থাকতে পারে, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া বা থাইরয়েডের সমস্যা। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুম না এলে আর কী করা যেতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, কগনিটিভ শাফলিং একটি সহায়ক কৌশল হলেও এটি ঘুমের ভালো অভ্যাসের বিকল্প নয়।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা শরীরের ঘড়িকে নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত আলো বা ক্যাফেইন এড়ানোও জরুরি।
ঘন্টার পর ঘন্টা বিছানায় জেগে থাকা ঠিক নয়। এতে শরীর বিছানাকে জেগে থাকার জায়গা হিসেবে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনে ঘুমের সময় কিছুটা পরিবর্তন করে ঘুমের গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

অনেক সময় উদ্বেগের চিন্তা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তা উল্টো আরও বেশি ফিরে আসে। তাই সন্ধ্যার দিকে কয়েক মিনিট সময় রেখে পরদিনের কাজের তালিকা করা বা নিজের উদ্বেগ লিখে রাখা উপকারী হতে পারে।
ক্যাফেইন সীমিত রাখা এবং বিশেষ করে বিকেলের পর থেকে কফি এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে অ্যালকোহল ঘুম পেতে সাহায্য করলেও পরে ঘুমের মান খারাপ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকলে অবশ্যই ঘুম বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই ঘুমের উন্নতি দেখা যায়।
রাফায়েল পেলায়োর ভাষায়, মানুষকে এই সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগে থাকতে হয় না—সঠিক সহায়তা পেলে ঘুম আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















