মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে একের পর এক হামলা ও হুমকির মাধ্যমে ইরান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ—হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরাকের উপকূলের কাছে বৃহস্পতিবার দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা হয় এবং সেগুলোতে আগুন ধরে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলাকালে এটি সাম্প্রতিক হামলাগুলোর একটি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ইরান পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উপকারে আসে এমন তেলবাহী জাহাজকে তারা এই প্রণালি দিয়ে যেতে দেবে না।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে বহু দেশ জরুরি তেল মজুত ব্যবহার শুরু করেছে।
জাহাজে হামলার মাধ্যমে ইরান কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। এতে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে ইরান নিজেও বড় আকারের সামরিক হামলার মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে গেলে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত ছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার কৌশলটি অব্যাহত রাখতে হবে।
%E0%A5%A4%20%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2%20%E0%A6%9B%E0%A6%AC%E0%A6%BF-%E0%A6%8F%E0%A6%8F%E0%A6%AB%E0%A6%AA%E0%A6%BF.webp)
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানায়, ইরাকের উপকূলের কাছে আক্রমণ করা দুটি ট্যাঙ্কারের একটি তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল। তাদের দাবি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী ওই জাহাজটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল।
একটি ব্রিটিশ নৌ পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, দুবাইয়ের কাছে আরেকটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বৃহস্পতিবার ইরাক ও ওমানের কয়েকটি তেল রপ্তানি টার্মিনালও বন্ধ রাখতে হয়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও বিস্তৃত ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পারস্য উপসাগর থেকে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য এটিই একমাত্র সমুদ্রপথ। ইরানের উপকূল এই প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের দুই পাশেই বিস্তৃত।
সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে—উত্তরে ইরান ও দক্ষিণে ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপের মাঝখানে—জাহাজ চলাচলের জন্য দুই দিকেই প্রায় দুই মাইল করে পথ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর বড় অংশ যায় এশিয়ায়—বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
এ ছাড়াও গাড়িবাহী জাহাজ, কনটেইনার জাহাজসহ বড় বড় পণ্যবাহী জাহাজও সাধারণত এই প্রণালি ব্যবহার করে। কাতার থেকে হিলিয়াম, ওমান ও সৌদি আরব থেকে সার এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা থেকে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামালও এই পথেই পরিবাহিত হয়।

কীভাবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করছে ইরান
ইরানের পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। তারা বিভিন্ন উপায়ে জাহাজ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলতে পারছে।
প্রজেক্টাইল ও ক্ষেপণাস্ত্র
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগর ও প্রণালিতে অন্তত এক ডজন তেলবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজে হামলা হয়েছে। এর কয়েকটির দায় ইরান স্বীকার করেছে। ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে সংঘাতের সময় ইরান বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।
সমুদ্র মাইন
যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে সমুদ্র মাইন ব্যবহার বাড়তে পারে। আকারে অনেক সময় একটি সৈকতের বলের মতো হলেও এই বিস্ফোরক বড় জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, বৃহস্পতিবার ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের অনেক বড় মাইন পাতা জাহাজ ধ্বংস করেছে। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কাছে শত শত ছোট নৌকা রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে তারা মাইন পেতে পারে।
বীমা ব্যয় বৃদ্ধি
অল্প কয়েকটি হামলার পরই প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চালানোর বীমা খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এই পথ ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাশ্রয়ী বীমা সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছেন, তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে সন্দিহান। একজন বিশ্লেষকের মতে, এর সম্ভাব্য খরচ ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে।
ইরানের নিজস্ব ট্যাঙ্কার
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ইরান নিজস্ব তেল রপ্তানির প্রয়োজনের কারণে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান নিজের জাহাজগুলোকে যেতে দিচ্ছে, একই সঙ্গে অন্যদের হুমকি দিচ্ছে বা আক্রমণ করছে।
১ মার্চের পর থেকে অন্তত ১০টি ইরানি ট্যাঙ্কার ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে বলে একটি শিপিং বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানায়।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বিশ্ব তেল ও গ্যাস বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলেছে, এটি বৈশ্বিক তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৪৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
এশিয়া সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই এই অঞ্চলে যায়। সরবরাহ সংকটের কারণে পাকিস্তানের মতো দেশগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২টি সদস্যদেশ তাদের কৌশলগত মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। কিন্তু এতে দাম খুব বেশি কমেনি। বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দাম আবার সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৩০ ডলার বেশি।
জ্বালানির উচ্চমূল্য বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও তেলের দাম বিশ্ববাজারে নির্ধারিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, দেশটি নিজে যত তেলই উৎপাদন করুক না কেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















