প্রাচীন মানুষের ভাষা কেমন ছিল—এই প্রশ্ন বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। এখন জীবাশ্মের প্রমাণ ও বায়োমেকানিক্যাল মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মানুষের সম্ভাব্য কণ্ঠস্বর পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
ভাষার উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক
মানুষের ভাষা এমন একটি ক্ষমতা, যা বিমূর্ত ধারণাও প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু এই ভাষার উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু গবেষকের মতে, প্রতীকী চিন্তার বিকাশের সঙ্গে হঠাৎ করেই ভাষার উদ্ভব হয়েছিল। অন্যরা মনে করেন, ভাষা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে—মানবদেহের স্বরযন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে এর বিকাশ ঘটেছে।
ভাষার প্রমাণ খুঁজতে গবেষণা
প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত সক্ষমতা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা নানা ধরনের শারীরিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে গুহাচিত্র, হাতে তৈরি পাথরের সরঞ্জাম এবং মাথার খুলি বা কঙ্কালের গঠন।
ব্রাইটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস কোল বলেন, প্রাচীন মানুষের তৈরি হাতকুড়াল বা পাথরের অস্ত্র তাদের বিমূর্ত চিন্তার ক্ষমতার প্রমাণ দেয়। আর বিমূর্ত চিন্তা ভাষা বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কণ্ঠস্বর পুনর্গঠনে নতুন প্রযুক্তি
প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টরির গবেষক আমেলি ভিয়ালে প্রাচীন মানুষের কঙ্কালের ছাপ বিশ্লেষণ করে তাদের জিহ্বা, ফুসফুস ও ল্যারিংস কীভাবে কাজ করত তা বোঝার চেষ্টা করছেন।
বায়োমেকানিক্যাল মডেল ব্যবহার করে তিনি অনুমান করছেন, সেই সময়কার মানুষ কী ধরনের শব্দ তৈরি করতে পারত। রেডিও ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে করা এই গবেষণার লক্ষ্য হলো—প্রাচীন মানুষের হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরকে নতুনভাবে কল্পনা করা।
বিভিন্ন সময়ের মানুষের সম্ভাব্য ভাষা
প্রায় ৩২ লাখ বছর আগে – অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস (লুসি)
এই প্রজাতির মানুষ সম্ভবত খুব সীমিত কিছু ধ্বনি ব্যবহার করে যোগাযোগ করত। তাদের যোগাযোগের ধরন ছিল আবেগ ও অঙ্গভঙ্গি নির্ভর। জটিল বাক্যগঠন তখনও তৈরি হয়নি।
প্রায় ১৬ লাখ বছর আগে – হোমো ইরেক্টাস (তুরকানা বয়)
এই সময়ের মানুষ তুলনামূলক বেশি ধরনের শব্দ উচ্চারণ করতে পারত। তারা হয়তো বস্তু বা কাজের অনুকরণে কিছু শব্দ ব্যবহার করত, যা যোগাযোগকে আরও ইচ্ছাকৃত ও স্পষ্ট করেছিল।
প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে – নিয়ান্ডারথাল (নানা)
নিয়ান্ডারথালদের শরীরের গঠন এমন ছিল যে তারা কথ্য ভাষা ব্যবহার করতে পারত। তাদের ভাষায় বাক্যগঠন ও অর্থ প্রকাশের ক্ষমতা ছিল। তবে বড় নাসারন্ধ্র ও শক্তিশালী ফুসফুসের কারণে তাদের কণ্ঠস্বর কিছুটা নাসিকাভিত্তিক শোনাত।
প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে – প্রাথমিক হোমো স্যাপিয়েন্স (ক্রো-ম্যাগনন ১ বা ‘দ্য ওল্ড ম্যান’)
এই সময়ের মানুষ আধুনিক মানুষের মতোই কণ্ঠস্বর ও চিন্তাশক্তির অধিকারী ছিল। তারা জটিল ভাষা ব্যবহার করতে পারত এবং বিমূর্ত চিন্তা ও প্রতীকী যোগাযোগের ক্ষমতা অর্জন করেছিল।
ভাষার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত
গবেষণায় দেখা গেছে, খুব প্রাচীন সময়ের মানুষও কিছু মৌলিক ধ্বনি ব্যবহার করত, যা আজও মানবভাষায় বিদ্যমান। উদাহরণ হিসেবে “মা” শব্দে ব্যবহৃত “ম” ধ্বনি উল্লেখ করা হয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভাষার কিছু উপাদান লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে আছে।
বর্তমানে বিশ্বে সাত হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। তবে এর প্রায় অর্ধেক ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মানব ইতিহাস বোঝার নতুন দিগন্ত
প্রাচীন মানুষের ভাষা নিয়ে এই গবেষণা শুধু মানব বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেই সহায়ক নয়। এটি ভবিষ্যতে ভাষা কীভাবে পরিবর্তিত ও বিকশিত হতে পারে, সেই ধারণাও দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















