০৪:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
বিলুপ্তির পথে প্রাণীজগৎ: টিকে থাকার শেষ লড়াই নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: সার সংকটে বিপর্যস্ত আমেরিকার কৃষক, বাড়ছে খাদ্যমূল্যের আশঙ্কা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে বিস্ফোরক পরিস্থিতি, যুদ্ধ থামাতে ‘জয় দেখানোর’ কৌশলে ট্রাম্প চীনে দূষণবিরোধী লড়াই থমকে কেন? অর্থনীতি, আবহাওয়া ও জনচাপ—সব মিলিয়ে জটিল সমীকরণ কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেছিলেন আফগান নীতি ভাঙনের মুখে পাকিস্তান, ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা সামনে জারার বিলাসী রূপান্তর: সস্তা ফ্যাশন থেকে প্রিমিয়াম সাম্রাজ্যে উত্থান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: বিশ্ব নেতৃত্বের পরীক্ষায় আমেরিকা, ব্যর্থ হলে কাঁপবে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য আসামে জঙ্গি হামলা: গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণে আহত ৪, পালিয়ে গেল হামলাকারীরা শিশুদের ক্ষতির দায়ে প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরুদ্ধে রায়, সামাজিক মাধ্যম নিয়ে নতুন দিগন্তের সূচনা

জাপান-ইউরোপ সরাসরি জাহাজ চলাচল টিকে গেল শেষ মুহূর্তে, নতুন পথে স্বস্তি পেল বাণিজ্য

জাপান ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি কন্টেইনার জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে গেল। চলতি বসন্তে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে জাপানের অর্থনীতি বড় ধাক্কায় পড়ত, বিশেষ করে যখন ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ইতিমধ্যেই বেড়েছে।

সংকটের সূচনা: পুরনো রুট বন্ধের ঘোষণা

গত ডিসেম্বরেই জাপানের তিনটি শিপিং প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি বড় সমুদ্র পরিবহন সংস্থা ঘোষণা দেয়, তারা এপ্রিল থেকে জাপান-ইউরোপ সরাসরি রুট বন্ধ করবে। ফলে জাপান থেকে পণ্য সরাসরি ইউরোপে না গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বন্দরে বড় জাহাজে স্থানান্তর করে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়।

Japan-Europe container shipping hangs on by a thread - Nikkei Asia

এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বিলম্ব, লোহিত সাগরে হামলার ঝুঁকি এড়াতে সুয়েজ খাল ছেড়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা, এবং একাধিক জাপানি বন্দরে থামার কারণে কার্যকারিতা কমে যাওয়া। একটি বন্দরে দেরি হলে সেটি অন্য বন্দরে গিয়ে আরও বাড়ত, যা পুরো রুটকে অকার্যকর করে তুলেছিল।

বিলুপ্তির মুখে ঐতিহাসিক রুট

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে চালু থাকা জাপান-ইউরোপ সরাসরি সমুদ্রপথ প্রথমবারের মতো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ জাপানের মোট বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে হয়, ফলে সরাসরি রুট না থাকলে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়ে।

নতুন উদ্যোগে রক্ষা পেল সংযোগ

Japan-Europe container shipping hangs on by a thread - Nikkei Asia

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের একটি বড় শিপিং কোম্পানি এগিয়ে এসে এপ্রিল থেকে নতুন সরাসরি রুট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন এই রুট জাপানের কোবে, নাগোয়া ও ইয়োকোহামা বন্দরে থামবে এবং সেখান থেকে চীনের কিছু বন্দর হয়ে উত্তর ইউরোপের প্রধান বন্দরে পণ্য পৌঁছে দেবে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি খাতের জোরালো প্রচেষ্টা ছিল। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি ফ্রান্সে গিয়ে আলোচনায় অংশ নেন, আর বেসরকারি খাতে শিপাররা একত্র হয়ে বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করে চাপ তৈরি করে।

জাপানি বন্দরের পিছিয়ে পড়া

তবে এই সাময়িক স্বস্তির মধ্যেও জাপানের বন্দর খাত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় জর্জরিত। বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার জাহাজ বড় আকার ধারণ করলেও জাপান সেই অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে ছিল। ফলে বুসান, সিঙ্গাপুর ও সাংহাইয়ের মতো বন্দরগুলো দ্রুত এগিয়ে যায়।

Ocean Network Express - Wikipedia

২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কন্টেইনার পরিবহন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলেও জাপানে বৃদ্ধি হয়েছে খুবই সামান্য। একই সময়ে টোকিও, ইয়োকোহামা, ওসাকা ও কোবের মতো বন্দরে দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি বাড়ছে

সরাসরি রুট কমে যাওয়ায় শিল্প খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। করোনা মহামারির সময় দেখা গেছে, বুসান বন্দরে পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে জাপানের পণ্য প্রাধান্য পায়নি, ফলে ৩০ থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ভূরাজনৈতিক চাপ। ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, আর তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামুদ্রিক তৎপরতা জাপানের কাছাকাছি সমুদ্রপথকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

চিত্র:Busan Port.JPG - উইকিভ্রমণ

সামনে অনিশ্চয়তা, তবু আশার আলো

সব মিলিয়ে জাপান-ইউরোপ সরাসরি জাহাজ চলাচল আপাতত টিকে থাকলেও ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া এই সংযোগ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বিলুপ্তির পথে প্রাণীজগৎ: টিকে থাকার শেষ লড়াই নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা

জাপান-ইউরোপ সরাসরি জাহাজ চলাচল টিকে গেল শেষ মুহূর্তে, নতুন পথে স্বস্তি পেল বাণিজ্য

০৩:২২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

জাপান ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি কন্টেইনার জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে গেল। চলতি বসন্তে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে জাপানের অর্থনীতি বড় ধাক্কায় পড়ত, বিশেষ করে যখন ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ইতিমধ্যেই বেড়েছে।

সংকটের সূচনা: পুরনো রুট বন্ধের ঘোষণা

গত ডিসেম্বরেই জাপানের তিনটি শিপিং প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি বড় সমুদ্র পরিবহন সংস্থা ঘোষণা দেয়, তারা এপ্রিল থেকে জাপান-ইউরোপ সরাসরি রুট বন্ধ করবে। ফলে জাপান থেকে পণ্য সরাসরি ইউরোপে না গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বন্দরে বড় জাহাজে স্থানান্তর করে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়।

Japan-Europe container shipping hangs on by a thread - Nikkei Asia

এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বিলম্ব, লোহিত সাগরে হামলার ঝুঁকি এড়াতে সুয়েজ খাল ছেড়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা, এবং একাধিক জাপানি বন্দরে থামার কারণে কার্যকারিতা কমে যাওয়া। একটি বন্দরে দেরি হলে সেটি অন্য বন্দরে গিয়ে আরও বাড়ত, যা পুরো রুটকে অকার্যকর করে তুলেছিল।

বিলুপ্তির মুখে ঐতিহাসিক রুট

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে চালু থাকা জাপান-ইউরোপ সরাসরি সমুদ্রপথ প্রথমবারের মতো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ জাপানের মোট বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে হয়, ফলে সরাসরি রুট না থাকলে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়ে।

নতুন উদ্যোগে রক্ষা পেল সংযোগ

Japan-Europe container shipping hangs on by a thread - Nikkei Asia

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের একটি বড় শিপিং কোম্পানি এগিয়ে এসে এপ্রিল থেকে নতুন সরাসরি রুট চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন এই রুট জাপানের কোবে, নাগোয়া ও ইয়োকোহামা বন্দরে থামবে এবং সেখান থেকে চীনের কিছু বন্দর হয়ে উত্তর ইউরোপের প্রধান বন্দরে পণ্য পৌঁছে দেবে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি খাতের জোরালো প্রচেষ্টা ছিল। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি ফ্রান্সে গিয়ে আলোচনায় অংশ নেন, আর বেসরকারি খাতে শিপাররা একত্র হয়ে বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করে চাপ তৈরি করে।

জাপানি বন্দরের পিছিয়ে পড়া

তবে এই সাময়িক স্বস্তির মধ্যেও জাপানের বন্দর খাত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় জর্জরিত। বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার জাহাজ বড় আকার ধারণ করলেও জাপান সেই অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে ছিল। ফলে বুসান, সিঙ্গাপুর ও সাংহাইয়ের মতো বন্দরগুলো দ্রুত এগিয়ে যায়।

Ocean Network Express - Wikipedia

২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কন্টেইনার পরিবহন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলেও জাপানে বৃদ্ধি হয়েছে খুবই সামান্য। একই সময়ে টোকিও, ইয়োকোহামা, ওসাকা ও কোবের মতো বন্দরে দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি বাড়ছে

সরাসরি রুট কমে যাওয়ায় শিল্প খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। করোনা মহামারির সময় দেখা গেছে, বুসান বন্দরে পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে জাপানের পণ্য প্রাধান্য পায়নি, ফলে ৩০ থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ভূরাজনৈতিক চাপ। ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, আর তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামুদ্রিক তৎপরতা জাপানের কাছাকাছি সমুদ্রপথকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

চিত্র:Busan Port.JPG - উইকিভ্রমণ

সামনে অনিশ্চয়তা, তবু আশার আলো

সব মিলিয়ে জাপান-ইউরোপ সরাসরি জাহাজ চলাচল আপাতত টিকে থাকলেও ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া এই সংযোগ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।