ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ঢেউ পৌঁছে গেছে আমেরিকার কৃষিখাতেও। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সার সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগায় কৃষকদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আর সেই চাপ ধীরে ধীরে ভোক্তাদের খাদ্যমূল্যেও প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সার ও জ্বালানির দামে হঠাৎ উল্লম্ফন
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর মার্চের শুরুতেই হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও সার পরিবহন হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
আমেরিকার কৃষকদের জন্য এই বৃদ্ধি সরাসরি আঘাত হয়ে এসেছে। প্রতি একরে সারের খরচ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষকের জন্য অতিরিক্ত লক্ষাধিক ডলার ব্যয় যোগ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লাভের মার্জিন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে তারা জানাচ্ছেন।

চাপে কৃষি উৎপাদন, বদলাতে পারে ফসলের ধরন
যেসব কৃষক আগেই সারের চুক্তি করে রেখেছিলেন, তারা আপাতত কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও অনেকেই এখন নতুন করে পরিকল্পনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ পর্যাপ্ত সার ছাড়া উৎপাদন অর্ধেক পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় অনেক কৃষক কম সার প্রয়োজন হয় এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। ভুট্টার মতো উচ্চ সারনির্ভর ফসলের পরিবর্তে সয়াবিনের মতো বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
আগেই সংকটে ছিল কৃষিখাত
এই যুদ্ধের আগেও আমেরিকার কৃষকেরা নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। ধান, ভুট্টা ও সয়াবিন দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত লাভ দিচ্ছিল না। যন্ত্রপাতি ও জমির খরচ বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে।
বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে সয়াবিনের চাহিদা কমে যাওয়ায় কৃষকেরা বড় ধাক্কা খেয়েছেন। একই সময়ে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম আরও কমে গেছে।

রাজনৈতিক সমর্থনেও টান পড়ার শঙ্কা
গ্রামীণ আমেরিকা ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিকভাবে একমুখী সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে কৃষকদের জীবিকা যখন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন সেই সমর্থনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কৃষি সংগঠনগুলো একদিকে আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানালেও অন্যদিকে সারের উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা শুল্ক শিথিলকরণসহ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
খাদ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে সময় লাগবে তিন থেকে ছয় মাস। ফলে ধীরে ধীরে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে পারে।
যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। তখন কৃষকের সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কেও বাড়িয়ে তুলবে।
সামনে আরও অনিশ্চয়তা
অনেক কৃষকের মতে, এই সংকট এতটাই গভীর যে একক কোনো আর্থিক সহায়তা দিয়ে তা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে থেকে যেতে পারে।
এখন বড় প্রশ্ন, কৃষকদের এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি কত দ্রুত স্থিতিশীল হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















