মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহে আমদানি-নির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন দেখা দিলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকটের আশঙ্কা
২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সংঘাত বাড়লে সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ—বন্ধ হয়ে গেলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জ্বালানি ও সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটে’ রূপ নিতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে ইরান জানিয়েছে, বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, ফলে বিকল্প উৎস দ্রুত খুঁজে পাওয়া কঠিন। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্ভরশীল দেশ, যেখানে প্রায় ৭২ শতাংশ জ্বালানি এই অঞ্চল থেকেই আসে।
দাম নয়, প্রধান ঝুঁকি সরবরাহ
এসঅ্যান্ডপি বলছে, বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতি। আগের সংকটগুলোতে দাম বৃদ্ধি বড় বিষয় ছিল, কিন্তু এবার বাস্তব জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বেশি, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ যেহেতু তেল, এলএনজি এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন দেখা দিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত এতে বড় ধাক্কা খেতে পারে।

মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতিতে চাপ
জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও সরবরাহ সংকট এশিয়াজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব হতে পারে—জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ও খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়া, এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি।
প্রতিবেদন আরও সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি স্থবির অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
কৃষিতে নতুন ঝুঁকি
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে সার সরবরাহে বিঘ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে সমস্যা তৈরি হওয়ায় ইউরিয়া ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের চালান ইতিমধ্যে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কৃষি অর্থনীতি ও সমাজে বড় ভূমিকা রাখে, সার আমদানি বিলম্বিত হলে ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
বৈদেশিক ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ
জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে দেশের আমদানি বিল আরও বৃদ্ধি পাবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমনিতেই মুদ্রাস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকট মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ—তার মধ্যে এই চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

রপ্তানিতে পরোক্ষ প্রভাব
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও পরোক্ষভাবে পড়তে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিতে অনিশ্চয়তা এশিয়ার দেশগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যের তাগিদ
এসঅ্যান্ডপি জোর দিয়ে বলেছে, এশিয়ার দেশগুলোর দ্রুত জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সার্বিকভাবে প্রতিবেদনের বার্তা স্পষ্ট—বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি কাঠামো তাকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব বিদ্যুৎ, মূল্যস্ফীতি, কৃষি ও রপ্তানি খাতে ছড়িয়ে পড়বে এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















