রাশিয়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি থেকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও দেশের ভেতরে নতুন এক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কঠোর পদক্ষেপে রাজধানী মস্কোসহ বড় শহরগুলোতে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ও রাজনৈতিক পরিবেশে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
যুদ্ধের লাভ, কিন্তু ভেতরে অস্থিরতা
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে পশ্চিমা সহায়তা কমে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে এসব ইতিবাচক দিকের মাঝেই মস্কোতে নতুন এক ভীতি কাজ করছে, যা এসেছে দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড থেকে।
হঠাৎ ইন্টারনেট বন্ধ: বড় শহরে ডিজিটাল অন্ধকার
মার্চের শুরুতে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই পরিস্থিতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
অনেকেই মনে করেন, এটি ছিল একটি নতুন ফায়ারওয়াল ব্যবস্থার পরীক্ষা, যার মাধ্যমে রাশিয়াকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র অনুমোদিত ওয়েবসাইট চালু রাখা সম্ভব হবে।
এর ফলে—
- পরিবারে যোগাযোগ ব্যাহত হয়
- অনলাইন সেবা বন্ধ হয়ে যায়
- ট্যাক্সি, ডেলিভারি ও পার্কিং সিস্টেম ভেঙে পড়ে
পুরোনো দিনের মতো ফোনে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি ধরতে হয় মানুষকে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অদ্ভুত পরিবর্তন
প্রতিদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ব্যবসায় প্রায় ১ বিলিয়ন রুবল ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এদিকে পুরোনো প্রযুক্তির চাহিদা বেড়ে গেছে—
- ওয়াকি-টকি
- পেজার
- কাগজের মানচিত্র
মস্কোর এক এলাকায় এমনকি পুরোনো পাবলিক টেলিফোন বসানো হয়েছে, যা মানুষের কাছে প্রতীকীভাবে “স্বাভাবিক জীবন” শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
“স্বাভাবিক জীবন” ভেঙে পড়ার শুরু
যুদ্ধের পরও মস্কোতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল—উৎসব, সাজসজ্জা, বিনোদন দিয়ে।
কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি রাজধানীর মানুষের জীবনে এসে পড়ে।
মানুষের মধ্যে এখন জরুরি পরিস্থিতির অনুভূতি তৈরি হয়েছে, এবং ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতিবাদের কথাও শোনা যাচ্ছে।
যুদ্ধ ক্লান্তি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ “যুদ্ধ ক্লান্তি” অনুভব করছে।
অনেকের কাছে যুদ্ধ এখন অচলাবস্থায় আটকে আছে—
- জয়ের সম্ভাবনা কম
- সমাধানের পথও স্পষ্ট নয়
এই মানসিক চাপ সরকারকে আরও নিয়ন্ত্রণমূলক পথে ঠেলে দিচ্ছে।
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ: ইরানের পথ অনুসরণ?
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ধীরে ধীরে একটি “বন্ধ রাষ্ট্র” মডেলের দিকে যাচ্ছে, যেখানে ইন্টারনেট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের নেতাদের টার্গেট করেছে, তা রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও আতঙ্ক তৈরি করেছে। ফলে তারা বাইরের যোগাযোগ সীমিত করতে চাইছে।
টেলিগ্রাম নিষিদ্ধের চেষ্টা
রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য—
- টেলিগ্রাম বন্ধ করে দেওয়া
- ব্যবহারকারীদের রাষ্ট্রীয় অ্যাপ “ম্যাক্স”-এ নিয়ে আসা
তবে এই উদ্যোগে বড় সমস্যা হলো, টেলিগ্রাম শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকার ও কর্মকর্তারাও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।
সরকারের ভেতরেই বিরোধ
কিছু কর্মকর্তা টেলিগ্রাম বন্ধের বিরোধিতা করেছেন।
তাদের মতে—
- তথ্যের অভাব নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি
- রাষ্ট্রীয় অ্যাপে নজরদারি থাকায় সেটি নিরাপদ নয়
এমনকি সরকারের মুখপাত্রও স্বীকার করেছেন, এতে আন্তর্জাতিক প্রচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রো-সরকার ব্লগারদের বিদ্রোহ
সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া এসেছে যুদ্ধপন্থী ব্লগারদের কাছ থেকে, যারা টেলিগ্রামের ওপর নির্ভরশীল।
একসময় সরকারের সমর্থক থাকা এক ব্লগার প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করেন।
এরপর তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণের চাপে নতুন বাস্তবতা
রাশিয়ার সরকার নিরাপত্তার নামে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে।
কিন্তু এই পদক্ষেপ—
- অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করছে
- সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাহত করছে
- রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়াচ্ছে
ফলে “যুদ্ধ ও স্বাভাবিক জীবনের ভারসাম্য” ভেঙে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 




















