মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দুবাই উপকূলের কাছে একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হামলা ও ট্যাংকারে আগুন
কুয়েতের পতাকাবাহী ‘আল-সালমি’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং এর গায়ে ক্ষতি হয়। ট্যাংকারটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার।
দুবাই কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংঘাতের বিস্তার ও হামলার পাল্টা হামলা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরায়েল তেহরান ও বৈরুতে ইরান-সমর্থিত অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। একই সময়ে লেবাননে সংঘর্ষে ইসরায়েলের কয়েকজন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে না দেওয়া হয়, তাহলে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেলক্ষেত্র ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
তবে একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে, যদিও প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তেলবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
এই হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে।
সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন শুরু করেছে, যার মধ্যে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের সদস্যরাও রয়েছে। এতে প্রয়োজনে স্থল অভিযানের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্কের মাধ্যমে ইরানের কাছে শান্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে ইরান এসব প্রস্তাবকে অবাস্তব ও অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধের ব্যয় ও রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার বাজেট চেয়েছে, যা কংগ্রেসে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর ওপর যুদ্ধের ব্যয় চাপানোর চিন্তাও করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















