তেহরানে ভয়াবহ রাতের অভিজ্ঞতা
ইরানের কারাজ শহরে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে আতঙ্কিত মানুষজনের দৃশ্যের মধ্যেই ফুটে উঠছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত তেহরান শহরে একের পর এক বিস্ফোরণে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্নের মতো।
একজন মা নিজের ছোট শিশুকে নিয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছেন, চারপাশে বিস্ফোরণের শব্দ। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা তড়িঘড়ি করে ৯০ বছর বয়সী অসুস্থ বৃদ্ধকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছেন, ঠিক জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ার আগমুহূর্তে। আবার একটি পরিবার ২২ তলা ভবন থেকে লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে, কারণ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আশঙ্কা।
রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
প্রায় এক কোটি মানুষের এই বিশাল শহরে ভয় আর অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে। শহরের উত্তরাংশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোও ভারী বোমা হামলার আওতায় পড়ে।
তেহরানের অন্তত ১৫ জন বাসিন্দা ফোন ও বার্তায় জানিয়েছেন, তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন প্রতিশোধের ভয়ে।

এক বাসিন্দা গোলশান ফাথি জানান, তিনি বাথরুমে লুকিয়ে আছেন এবং আতঙ্কে কিছুই ভাবতে পারছেন না। তার ভাষায়, কী হবে সামনে—তা নিয়ে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন।
আরেক বাসিন্দা সাঘার বলেন, তাদের বাড়ি এত জোরে কেঁপে উঠেছিল যে তিনি মনে করেছিলেন পুরো ভবন ধসে পড়বে। তার মনে হয়েছিল, এটাই হয়তো শেষ মুহূর্ত।
যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তীব্র সংঘাতের মধ্যে পড়ে সাধারণ ইরানিরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুমকি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর, গবেষণা কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়—সবই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
একজন ব্যবসায়ী আফশিন বলেন, তার চোখের সামনে দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে

মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের ১৩টি প্রদেশে ২০৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অন্তত একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৬০৭ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।
সংঘাতের নতুন উত্তেজনা
শুক্রবার ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করা হয়েছে। বিমানের দুই আরোহীর একজনকে উদ্ধার করা হলেও অপরজনকে খুঁজতে মার্কিন উদ্ধারকারী দল এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে।
এছাড়া পারস্য উপসাগরে একটি মার্কিন এ-১০ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও ইরান নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করেছে। একই সময়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারেও গুলি চালানো হয়, যা পরে ইরানের বাইরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়।
সরকারপন্থীদের উচ্ছ্বাস, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
তেহরানের বিভিন্ন স্থানে সরকারপন্থী সমর্থকরা পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমে মার্কিন বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা উদযাপন করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে এই দৃশ্য দেখা গেছে।

কয়েকটি পত্রিকার শিরোনামে লেখা হয়, আকাশ এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং পরাজয়ের কল্পনার সমাপ্তি ঘটেছে।
তবে অনেকেই এর পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত।
একজন হিসাবরক্ষক রেজা বলেন, যদি নিখোঁজ মার্কিন পাইলটকে আটক করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তিনি জানান, ওই রাতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তারা ভবনের বেসমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন।
সামাজিক মাধ্যমে আতঙ্কের প্রতিফলন
ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পারা অনেক ইরানি সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।
তেহরানের সাংবাদিক মিলাদ আলাভি লিখেছেন, উত্তর তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় মানুষ আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















