ইরানে চলমান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়—এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও ফসল উৎপাদনের জন্যও ভয়ঙ্কর হুমকি।
ইরান-মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এখন সরাসরি বাংলাদেশে ধানের বোরো মৌসুমের ওপর পড়ছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু শিল্পখাত নয়, কৃষিক্ষেত্রেও মারাত্মক।
ডীজেল সংকট: সেচের জন্য কৃষকের ভোগান্তি
বোরো ধানের মৌসুমে সেচের জন্য ডীজেল না পাওয়া সবচেয়ে বড় সমস্যা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক আব্দুর রহমান গাজি জানিয়েছেন, সেচের অভাবে তার দুই বিঘা জমিতে ফলন ৫০ মণ পর্যন্ত কমতে পারে। তিনি বলেন, “এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, দূরের যুদ্ধনেতাদের অযথা সিদ্ধান্তের ফল।”
সরকারি নিয়ন্ত্রণে তেল বিক্রয় সীমিত থাকায় কৃষকরা ডীজেল সহজে পাচ্ছেন না। বাজারে থাকলেও দাম আকাশচুম্বী। ফলে ফসল ঝরে যাওয়া আর দামের উত্থান না থামলে খাদ্য নিরাপত্তার উপর মারাত্মক চাপ পড়বে।

সারের সংকট ও মূল্যস্ফীতি
ইরান যুদ্ধের কারণে সার উৎপাদন ও সরবরাহ বিপর্যস্ত। বাংলাদেশের চারটি বড় সার কারখানা গ্যাস সংকটে বন্ধ। দেশের কাছে মাত্র ১.৮ মিলিয়ন টন সার মজুদ আছে, যা বার্ষিক চাহিদার ৬.৯ মিলিয়ন টনের তুলনায় অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম গত কয়েক মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সতর্কবার্তা
ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (ফা-ও) জানিয়েছে, চলমান সংকট বিশ্ব খাদ্য বাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সরাসরি এর প্রভাব অনুভব করছে। যদি কৃষকরা সময়মতো সার ও সেচ পান না, ফসলের পরিমাণ কমবে, বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ আরও বেড়ে যাবে।

অভ্যন্তরীণ বাজারের বাধা
ডীজেল সংকটের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক কারণ নয়, অভ্যন্তরীণ মজুদ ও কালোবাজারও বড় ভূমিকা রাখছে। চট্টগ্রামে ৩৭,০০০ লিটার অবৈধ ডীজেল জব্দ হয়েছে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে।
সরকারের করণীয়
কৃষি খাত রক্ষায় সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ডীজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা, সার মজুদ ও আমদানি পরিকল্পনা সুসংহত করা এবং কৃষক সহায়তা প্রদান জরুরি। বাজারে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান যুদ্ধ দূরের সংঘাত হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশে স্পষ্ট। বোরো মৌসুমের সময় যদি সরকার ও কৃষি কর্মকর্তারা দ্রুত ব্যবস্থা না নেন, তাহলে ফসলের ক্ষতি শুধু কৃষকের নয়, সমগ্র দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















