ঐতিহ্যগতভাবে বিনিয়োগকারীরা সব সময় এমন সম্পদ খোঁজেন যা শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং নিয়মিত আয়ও দেয়। বন্ড সুদ বা কুপন প্রদান করে, স্টক লভ্যাংশ দেয়। স্বর্ণ এর দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনো নগদ প্রবাহ তৈরি করে না। গহনা বা ইলেকট্রনিক্সে স্বর্ণের ব্যবহার থাকলেও, এই ব্যবহার তার বিশাল উপস্থিতি ও বাজার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে অনেকটা নগন্য।
স্বর্ণ রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো এক ধরনের বীমা। মানুষের সহস্রাব্দের আগ্রহ ও বিশ্বাসের কারণে এর মান কখনো শূন্যে নেমে যায় না বলে ধারণা করা হয়। অতীত ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন অন্যান্য সম্পদ বিপর্যয়ে থাকে, তখন স্বর্ণের মূল্য প্রায়শই বৃদ্ধি পায়। তাই অনেক বিনিয়োগকারী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা বাজার পতনের সময় স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেন।

ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেল ও জ্বালানি বাজারে বিশাল অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাধারণত এমন সময় স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণের সময় স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের পরও স্বর্ণের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু এইবার স্বর্ণের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, যা বৈশ্বিক শেয়ারের পতনের চেয়েও বেশি।
স্বর্ণের এই হ্রাসের একটি কারণ হলো বাস্তব আয়ের বন্ড বা ইনফ্লেশন-প্রটেক্টেড বন্ডের রিটার্নের বৃদ্ধি। স্বর্ণ কোনো সুদ প্রদান করে না, তবে মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি থেকে এর মূলধন সুরক্ষিত থাকে। যখন এই ধরনের বন্ডের রিটার্ন বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের তুলনায় সেগুলোকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দশ বছরের আমেরিকান ট্রেজারি বন্ডের বাস্তব আয় ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। ফলে কেন্দ্রিয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
এছাড়া কেন্দ্রিয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের বাজারে হস্তক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রাশিয়া, যার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইউক্রেনে আক্রমণের পর ফ্রিজ হয়ে গেছে, সেখানে স্বর্ণ ডলারের অস্ত্রায়ন থেকে রক্ষা দেয়। কিছু দেশ যেমন তুরস্ক, স্বর্ণ বিক্রি করে তাদের মুদ্রার মান ধরে রাখে। ভারতও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে পারে। পোল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি বলেছেন, স্বর্ণ বিক্রির মুনাফা দেশের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধুমাত্র বাস্তব আয়ের বৃদ্ধি বা কেন্দ্রিয় ব্যাংকের বিক্রয় স্বর্ণের সাম্প্রতিক মূল্য পতনকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। আরেকটি কারণ হলো স্বর্ণ এখন একটি মিম ট্রেডের মতো আচরণ করছে। গত বছর গ্রীষ্ম থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই সময় স্বর্ণ এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বর্তমানে কিছু স্পেকুলেটিভ বিনিয়োগ দ্রুত বিক্রি হওয়ায় স্বর্ণের পতন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি দেখায় যে স্বর্ণ সর্বদা একটি নিরাপদ আশ্রয় নয়। ইতিহাসে এর প্রধান আকর্ষণ হলো মুদ্রার মান হ্রাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা। যখন বিশ্বব্যাপী ঋণ বাড়ছে এবং সরকার মুদ্রাস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করছে, তখন স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে বাজারে মিম ট্রেডার এবং ডেবাসমেন্ট ট্রেডারের ভারসাম্য না থাকলে স্বর্ণের বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোমেন্টাম ট্রেডাররা অন্য কোনো সম্পদে চলে যাবে, আর ডেবাসমেন্ট ট্রেড আবার স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা দিতে পারে। তবে সঠিক দাম কখন স্থিতিশীল করবে তা নির্ধারণ করা কঠিন। এই সময় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা এবং বাজারের প্রতিটি সংকেত মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















