ইরানে চলমান যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা যখন প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে, তখন শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ খুলে যায়। পাকিস্তানের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি আলোচনায় আনতেও ভূমিকা রাখে ইসলামাবাদ।
সৌদি আরবের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ইরানের হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রিয়াদের তীব্র ক্ষোভে কয়েক সপ্তাহের গোপন যোগাযোগ এবং সমঝোতার প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ঠিক এই অবস্থায় পাকিস্তান রাতভর বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে দুই পক্ষকে নতুন করে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালায়।
শেষ মুহূর্তের তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মধ্যে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা বহনে সক্রিয় হন। সূত্রগুলো বলছে, এই যোগাযোগে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়।
একটি সূত্র জানায়, কয়েক ঘণ্টার অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার পর ইরান শেষ পর্যন্ত কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং আলোচনায় বসতেও রাজি হয়। তখন তাদের কাছে পরিষ্কার ছিল, আর সময় বাড়ানো হবে না।

সৌদি হামলার পর নতুন সংকট
সৌদি আরবের স্থাপনায় হামলার ঘটনায় পাকিস্তান একদিকে ইরানের কাছে কঠোর অসন্তোষ জানায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চায় যাতে ইসরায়েল নতুন করে ইরানে হামলা না চালায়। কারণ, ইসলামাবাদের মতে ইসরায়েলি আঘাত চলতে থাকলে তেহরানকে আলোচনায় আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সৌদি স্থাপনাকে লক্ষ্য করেছে ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায়। তাদের অবস্থান ছিল, এ ধরনের আক্রমণ অব্যাহত থাকলে আলোচনায় যাওয়া কঠিন।
এর পর পাকিস্তান ওয়াশিংটনকে জানায়, ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ তাদের শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইসরায়েলকে সংযত রাখার আশ্বাস পাওয়ার পরই তেহরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানো সম্ভব হয়।
ইসরায়েলের আপত্তি, শেষ পর্যন্ত সমর্থন
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের দাবি, ইসরায়েল শুরুতে চুক্তির বিপক্ষে ছিল। তাদের ধারণা ছিল, সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে ইরানের নেতৃত্বকে আরও দুর্বল করা সম্ভব। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়ার পথেই যায় তারা।
একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধবিরতির অর্থ এই নয় যে সংঘাত স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে গেছে, কিংবা ইরানকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক উপকরণ হস্তান্তর, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থামানোর দাবি তুলবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও এক ভাষণে বলেন, তাদের সব লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তবে তা হয় আলোচনার মাধ্যমে, নয়তো পুনরায় যুদ্ধ শুরু করেও অর্জন করা যেতে পারে। তার ভাষায়, ইসরায়েলের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে।
রাতভর দৌড়ঝাঁপ
স্থানীয় সময় মধ্যরাতের দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানান। সূত্রের ভাষ্য, এই আহ্বান ছিল সমন্বিত কৌশলের অংশ, কারণ নীতিগতভাবে তখন দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিকের মতে, আলোচনায় একটি ১৫ দফা মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়। মূল প্রশ্ন ছিল দুটি—যুদ্ধবিরতির কাঠামো কেমন হবে এবং পরবর্তী আলোচনার সীমারেখা কী হবে।
ইরানের দাবি ও জটিলতা
আলোচনায় ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌম কর্তৃত্বের স্বীকৃতি চেয়েছে বলে জানা গেছে। এই দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। পাশাপাশি তেহরান পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি করার স্বাধীনতাও চাইছে।
মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা করছেন, এমন সব স্পর্শকাতর বিষয় শুরুতেই সামনে না এনে আলোচনাকে সচল রাখা যায় কি না। কারণ এসব প্রশ্ন থেকেই তাৎক্ষণিক নতুন সংঘাতের জন্ম হতে পারে।

শনিবার শুরু হবে আলোচনা
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিশেষ দূত এবং প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টা। অন্যদিকে পাকিস্তানি সূত্র বলছে, ইরানের প্রতিনিধি দলে থাকবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পার্লামেন্টের স্পিকার।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ইরানকে কোনো শর্ত ছাড়াই যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানো।
একটি সূত্রের ভাষায়, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরান কঠোর অবস্থানে ছিল। তারা প্রথমে নিজেদের দাবি সামনে আনতে চেয়েছিল। পাকিস্তান তখন তাদের বোঝায়, দাবি পরের আলোচনার জন্য তুলে রাখা যেতে পারে, আগে যুদ্ধ থামানো জরুরি।
পাকিস্তানের ভূমিকায় নতুন গুরুত্ব
যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানোর সময় ইসলামাবাদের আকাশে প্রায় ভোর হয়ে এসেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পরে বলেন, তারা সারারাত কাজ করেছেন। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা একসময় বইয়ে লেখা হলে তা হতাশার মধ্যেও হাল না ছাড়ার এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।
এই ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু সামরিক শক্তি নয়, আঞ্চলিক কূটনীতিও মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থির এক সংকটে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যখন সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন শেষ মুহূর্তের যোগাযোগও ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















