দেশের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প এখন এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং করের চাপ বাড়ায় এই খাতটি টিকে থাকার লড়াই করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই শিল্প ধসে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টিতে।
বাড়ছে খরচ, কমছে প্রবৃদ্ধি
গত পাঁচ বছরে পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে খরচের সূচক ছিল ১০০, তা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০ এবং ২০২৫ সালে তা ১৯০-এ পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে খাতটির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
করের বোঝা বাড়াচ্ছে সংকট
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্পোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং অগ্রিম আয়কর বাড়ানো—এসবই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হয়েছে।
খামারিদের মোট খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই যায় খাদ্যে। অথচ খাদ্য উপকরণ আমদানিতে এখনও কর বহাল রয়েছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খাদ্য উৎপাদন খরচ কমানোর তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কারণ, খামারিদের ব্যয়ের বড় অংশ এখানেই খরচ হয়। খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানির ওপর কর কমানো জরুরি বলে মত দেন তারা।
দেশীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনার কথাও বলা হচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি কর
বাংলাদেশে পোল্ট্রি খাতে করের হার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। অন্য দেশে যেখানে কর ছাড় বা কম করের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে পড়ছেন।
প্রান্তিক খামারিদের কঠিন বাস্তবতা
খামারিরা জানান, একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ে ১০.৫০ থেকে ১১ টাকা, কিন্তু পাইকারিতে বিক্রি করতে হয় ৭.৫০ থেকে ৮.৫০ টাকায়। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ কেজিতে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা হলেও বিক্রি হয় প্রায় একই দামে, ফলে লাভের সুযোগ প্রায় নেই।
বড় কোম্পানির দখলের আশঙ্কা
খাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রান্তিক খামারিরা বাজার থেকে ছিটকে পড়লে পুরো শিল্প বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন ভোক্তাদের উচ্চ দামে ডিম ও মাংস কিনতে বাধ্য হতে হবে।
কর কমানো ও প্রণোদনার দাবি
বিশেষজ্ঞরা কর্পোরেট কর ১০ শতাংশে নামানো, টার্নওভার কর কমানো, অগ্রিম আয়কর হ্রাস, বিদ্যুতে ভর্তুকি এবং খামারিদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি পোল্ট্রি পণ্যের বিক্রিতে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাবও এসেছে।
এই খাতে ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে এই শিল্প ধসে পড়লে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
পোল্ট্রি শিল্প সংকট: করের চাপ ও উৎপাদন খরচে বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ
পোল্ট্রি শিল্পে বাড়তি কর ও উৎপাদন খরচে সংকট তীব্র, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ধসের আশঙ্কা
Sarakhon Report 



















