মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমেনি। বরং এই পথকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রণালিতে চলাচল: নিরাপদ নয়, বরং জটিল
যুদ্ধ চলাকালে হামলার ঝুঁকিতে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধবিরতির পর সেই ঝুঁকি কিছুটা কমলেও বাস্তবে পরিস্থিতি সহজ হয়নি। ইরান এখনও পুরোপুরি পথ খুলে দেয়নি। বরং তারা নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে সীমিতভাবে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন এই প্রণালিকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে যেসব দেশ এই পথ ব্যবহার করে তেল বা পণ্য পরিবহন করে, তারা এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে।
দেশগুলোর জন্য ‘দুই শক্তির মাঝে’ পরিস্থিতি
হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হচ্ছে। ইরান সরাসরি কিছু দেশের সঙ্গে আলাদা চুক্তির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও বাধ্য হচ্ছে ইরানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় যেতে, কারণ বিকল্প পথ নেই।
কৌশলগত বার্তা: কোন দেশ পাবে সুবিধা
ইরান যেসব দেশকে শত্রু মনে করছে না বা যাদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে, তাদের জাহাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে একটি ইউরোপীয় জাহাজ নিরাপদে পার হওয়ার ঘটনাকে বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
এতে বোঝানো হচ্ছে, যারা নিরপেক্ষ বা ইরানের প্রতি নমনীয় অবস্থান নেবে, তারা সুবিধা পেতে পারে।

জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা ও নতুন শর্ত
বর্তমানে খুব কমসংখ্যক জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারছে। অনেক ক্ষেত্রে তেলবাহী জাহাজও আটকে রাখা হচ্ছে। ইরান দাবি করছে, এখনও পানিতে মাইন রয়েছে, তাই তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।
এছাড়া একটি বিকল্প পথ ব্যবহার করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণের আরও কাছে। এর মাধ্যমে জাহাজ যাচাই ও সম্ভাব্য ফি আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
টোল আরোপের পরিকল্পনা
ইরান ভবিষ্যতে এই পথ ব্যবহার করতে জাহাজপ্রতি প্রায় ২০ লাখ ডলার ফি নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এই অর্থ যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচল স্বাধীন হওয়া উচিত এবং এর জন্য কোনো ফি থাকা উচিত নয়।
ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
ইউরোপীয় দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে, কারণ তারা পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশও সম্ভাব্য টোল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
তারা আশঙ্কা করছে, এতে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়বে।
আটকে থাকা জাহাজ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
যুদ্ধের কারণে শত শত জাহাজ প্রণালির আশপাশে আটকে রয়েছে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের জাহাজ পার করাতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।
তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো কিছুটা সফল হয়েছে, কারণ তারা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় এক হাজার জাহাজ এই অঞ্চলে আটকে রয়েছে। বর্তমান গতিতে সব জাহাজ চলাচল করতে পারবে না, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার। এটি ব্যবহার করে তারা আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারছে।
যুদ্ধবিরতি হলেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা কমেনি। বরং এটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত ব্যবহার বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















