ভারতের চলমান বিধানসভা নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই নির্বাচনগুলো দলকেন্দ্রিক কম, বরং আসামের, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের ব্যক্তিত্বকে ঘিরেই বেশি আবর্তিত হচ্ছে। ভালো বা খারাপ—যাই হোক না কেন, এই চার নেতা নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের দলকেও ছাপিয়ে গেছেন, আর ভোটও চাওয়া হচ্ছে তাদের নামেই।
তবে এর মানে এই নয় যে, তারা সমালোচনা বা বিরোধিতার বাইরে। আসামে ভোটের আগে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ও তার স্ত্রীকে নিয়ে তীব্র আক্রমণ চালিয়ে তাকে দেশের “সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ও সাম্প্রদায়িক মুখ্যমন্ত্রী” বলে অভিযোগ তোলে।
কেরালা: পিনারাই বিজয়ন
বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, কেরালার পিনারাই বিজয়ন ছাড়া অন্য তিন মুখ্যমন্ত্রী পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে পারেন। তবে কেরালায় টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরা একটি বিরল ঘটনা। ঐতিহ্যগতভাবে রাজ্যটি প্রতি মেয়াদে সরকার পরিবর্তনের জন্য পরিচিত।
পিনারাই বিজয়ন ২০২১ সালে কংগ্রেসকে পরাজিত করেছিলেন। তিনি কঠোর ও কম হাস্যোজ্জ্বল নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের প্রয়োজনে বাজারনীতি, আরএসএস ও কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এই কারণে কেউ কেউ তাকে আদর্শের চেয়ে ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও করেন।
বর্তমানে তিনি কংগ্রেসের উত্থান ও বিজেপির শক্ত অবস্থানের মুখে রয়েছেন। এমনকি গোপনে বিজেপি কংগ্রেস সরকারের চেয়ে তাকে বেশি পছন্দ করে বলেও ধারণা রয়েছে। তার দল এই নির্বাচনকে তার নেতৃত্বের উপর গণভোট হিসেবে দেখছে। ৮১ বছর বয়সী এই নেতার জন্য ঝুঁকিও অনেক—হারলে দেশের বাম রাজনীতির অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।

তামিলনাড়ু: এম কে স্টালিন
স্টালিনের জন্য ২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়া সহজ ছিল না, কারণ তাকে তার বাবা ও পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধির উত্তরসূরি হতে হয়েছে। ডিএমকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও স্টালিন ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন।
তার বিরোধীরাও তার নম্রতা ও সমন্বয়মূলক আচরণের প্রশংসা করেন। তবে এই নির্বাচনে ডিএমকের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে অভিনেতা বিজয়ের নতুন দল কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তার উপর।
বিজয় তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়। তিনি যদি উল্লেখযোগ্য ভোট পান, তাহলে বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে ডিএমকের জন্য সুবিধা হতে পারে। কিন্তু যদি তার ভোট ১৫ শতাংশের বেশি হয় এবং ঝুলন্ত বিধানসভা তৈরি হয়, তাহলে ডিএমকের জন্য তা বিপদের কারণ হতে পারে।
আসাম: হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
ডিএমকে বা তৃণমূলের মতো দলগুলো যেখানে ব্যক্তিনির্ভর, সেখানে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মূলত বিজেপির কাঠামোর ভেতর থেকেই উঠে এসেছেন। তবে তিনি নিজস্ব প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাকে ‘মামা’ নামে ডাকা হয়। বিজেপি তাকে অন্য অনেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা দিয়েছে।
তিনি অবৈধ অভিবাসন, হিন্দুত্ব ও নাগরিকপঞ্জি ইস্যুকে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দিয়েছেন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন।
কংগ্রেসের কাছে আসাম ছিল একটি সম্ভাবনাময় রাজ্য। কিন্তু শর্মার নেতৃত্বে বিজেপি আবারও ক্ষমতায় ফেরার আশায় রয়েছে। বিজেপি মূলত হিন্দুপ্রধান ১০৩টি আসনে জোর দিচ্ছে এবং মুসলিমপ্রধান ২৩টি আসন প্রায় ছেড়ে দিয়েছে।
কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ ভালো লড়াই দিলেও সংগঠনের দুর্বলতা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরপর তিনটি নির্বাচনে হারলে পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে—ফলে আসামও কংগ্রেসের হাতছাড়া হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
চার মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সমর্থকদের মতে, এই নির্বাচন ‘মমতা বনাম নির্বাচন কমিশন’। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়ার বিষয়টি বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে নিজে উপস্থিত হয়ে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করে তিনি নিজের লড়াকু ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করেছেন। কংগ্রেসকে সরিয়ে, ৩৪ বছরের বাম শাসন শেষ করে এবং পাঁচটি নির্বাচনে বিজেপিকে প্রতিহত করে তিনি নিজেকে শক্ত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরলে জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিরোধী জোটের নেতৃত্বের জন্যও তার নাম আলোচনায় এসেছে।
এদিকে বিজেপি নারী সংরক্ষণ বিল পাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা মমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কারণ মমতার সমর্থনে নারী, সংখ্যালঘু ও বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোটার রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করছে—ভারতের রাজনীতিতে আদর্শ বা প্রচারণার চেয়ে অনেক সময় নেতার ব্যক্তিত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নীরজা চৌধুরী 


















