একজন অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে শুরু হওয়া একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ—এমন পরিস্থিতি সাধারণত বিরোধী দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এখনো সুস্পষ্ট কোনো নেতৃত্ব বা ঐক্যবদ্ধ আদর্শ দাঁড় করাতে পারেনি। বরং দলটির ভেতরে মতাদর্শিক বিভাজন ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাইমারি প্রক্রিয়া মার্চের শুরুতে শুরু হয়েছে এবং তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের লাখো ভোটারের মতামত সামনে আসবে, যা স্পষ্ট করে দেবে—দলের ভেতরে কোন গোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় প্রায় ১৯ হাজার ডেমোক্র্যাট সমর্থকের ওপর করা একটি বিস্তৃত জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দলটির ভেতরে চারটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী বা ধারা গড়ে উঠেছে। নীতি, অর্থনীতি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এই গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান আলাদা, যা দলীয় ঐক্যের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রগতিশীলদের বিস্তৃত প্রভাব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী হলো প্রগতিশীলরা, যাদের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ। এরা তুলনামূলকভাবে তরুণ, উচ্চশিক্ষিত এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই গোষ্ঠীর মূল বিশ্বাস হলো—সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা অপরিহার্য।
এই গোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মনে করেন, কল্যাণমূলক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো উচিত। প্রায় ৭০ শতাংশ প্রগতিশীল এ বিষয়ে একমত, যা দলের অন্য যেকোনো গোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পক্ষেও তারা দৃঢ় অবস্থান নেয়। সামাজিক বাস্তবতার দিক থেকে তারা বিশ্বাস করে, শ্বেতাঙ্গদের একটি কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, যা বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
প্রতিষ্ঠানপন্থীদের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী অবস্থান
দ্বিতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানপন্থী ডেমোক্র্যাটরা, যাদের অংশ প্রায় ২৯ শতাংশ। এদের গড় বয়স তুলনামূলকভাবে বেশি এবং তারা নীতিনির্ধারণে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে তারা প্রগতিশীলদের সঙ্গে অনেকাংশে একমত হলেও নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক।
এই গোষ্ঠীর বড় অংশ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পক্ষে। প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য সীমান্তে টহল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। একই সঙ্গে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পুলিশ বাজেট কমানোর বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী রাখা জরুরি।
বুটস্ট্র্যাপ গোষ্ঠীর মূল্যবোধনির্ভর ও রক্ষণশীল প্রবণতা
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তৃতীয় বড় গোষ্ঠী হলো বুটস্ট্র্যাপ ডেমোক্র্যাটরা, যাদের অংশ প্রায় ১৮ শতাংশ। এই গোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ধর্মপ্রাণ এবং ব্যক্তিগত পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাদের কিছু মতামত রিপাবলিকানদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা তাদের অবস্থানকে আলাদা করে তোলে।
এই গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মনে করে, সমাজে উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাই মূল চাবিকাঠি। অন্য সংখ্যালঘুরা যেভাবে বৈষম্য অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে, একইভাবে এগিয়ে যাওয়াই উচিত—এমন ধারণা তাদের মধ্যে প্রবল। যদিও তারা গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করে, তবে এই সমর্থনের হার অন্য গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় কম, প্রায় ৬৮ শতাংশ। তবে করনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে তারা দলের মূলধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পররাষ্ট্রনীতিতে স্পষ্ট ভিন্নতা
সবচেয়ে ছোট গোষ্ঠী হলো বিচ্ছিন্নতাবাদীরা, যাদের অংশ প্রায় ১৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ নীতিতে তারা প্রগতিশীলদের সঙ্গে অনেকটাই মিল রাখলেও পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে ভিন্ন।
এই গোষ্ঠীর অধিকাংশই মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়ানো উচিত নয়। ইউক্রেন ও গাজা ইস্যুতে প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্য সামরিক সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করেন। তাদের মধ্যে নারী, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক সমর্থকের হার বেশি এবং উচ্চশিক্ষার হার তুলনামূলকভাবে কম। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্বতন্ত্র করে তোলে।
ঐক্যের সন্ধানে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কঠিন পথ
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে এই চারটি গোষ্ঠীর উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়ে তোলা। মতাদর্শিক বৈচিত্র্য একদিকে যেমন শক্তি, অন্যদিকে তা বিভাজনের কারণও হতে পারে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই বিভাজন কাটিয়ে ওঠা না গেলে দলীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে প্রগতিশীল গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে সম্ভাব্য নেতাদের জন্য এই গোষ্ঠীকে সঙ্গে রাখা অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে বিভাজনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের সম্ভাবনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















