এক সময় ব্রিটেনে বিরক্তি যেন ছিল এক ধরনের মানসিক মহামারি। মানুষের জীবনে এর উপস্থিতি এতটাই প্রবল ছিল যে তা নিয়ে দার্শনিক থেকে সাহিত্যিক—সবার মধ্যেই চলত তুমুল আলোচনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে—বিরক্তি কমে যাওয়াটা কি সত্যিই ভালো, নাকি এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন ধরনের বিপদ?
বিরক্তির জন্ম ও বিস্তার
আঠারো শতকে ব্রিটেনে ‘বিরক্তি’ যেন নতুন এক অনুভূতি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি শুধু একঘেয়েমি নয়, বরং মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি এমনকি জীবনের প্রতি অনীহা তৈরি করত। সেই সময় অনেকেই এটিকে ভয়ংকর এক ‘রোগ’ হিসেবে দেখতেন।
ধীরে ধীরে এই অনুভূতি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী থেকে সাহিত্যিক—প্রায় সবাই নিজেদের জীবনে বিরক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অনেকেই একে ‘মহামারি’ বলেও অভিহিত করেন।

দোষ কার—সমাজ নাকি সংস্কৃতি?
বিরক্তির উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলেছে। কেউ দায়ী করেছেন পুঁজিবাদকে, কেউ সমাজতন্ত্রকে, আবার কেউ তরুণ প্রজন্মকে। এমনকি ফরাসিদের দিকেও আঙুল তুলেছিল ইংরেজ সমাজ।
আসলে, এটি ছিল সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মানসিকতার এক প্রতিফলন। আধুনিকতা যত বাড়তে থাকে, মানুষের প্রত্যাশাও তত বাড়ে—আর সেই ফাঁক থেকেই জন্ম নেয় বিরক্তি।
বিজ্ঞানও মেপেছে বিরক্তি
বিরক্তিকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরাও বসে থাকেননি। বিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয় ‘বিরক্তি মাপার স্কেল’, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হতো তারা কতটা সহজে বিরক্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি বিরক্ত হয় তারা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে বেশি জড়িয়ে পড়ে—যেমন অতিরিক্ত মদ্যপান বা অন্যকে কষ্ট দেওয়া। এমনকি এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ একা বসে থাকার চেয়ে নিজেরাই বৈদ্যুতিক শক নিতে রাজি হয়েছে, শুধু বিরক্তি এড়াতে।
স্মার্টফোন যুগে হারিয়ে যাচ্ছে বিরক্তি
বর্তমান সময়ে বিরক্তির জায়গা দখল করেছে চাপ ও উদ্বেগ। স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তি মানুষের অবসর সময়কে ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে শিখিয়েছে।
মানুষ এখন আর একা বসে চিন্তা করে না, বরং অবিরাম স্ক্রল করে। এতে সাময়িকভাবে বিরক্তি দূর হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থবহ কাজের অভাব তৈরি হয়। গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন মানুষের সৃজনশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

কমে যাওয়া কি সত্যিই ভালো?
পরোক্ষভাবে দেখা যাচ্ছে, যেসব কাজ মানুষ আগে বিরক্তি কাটাতে করত—যেমন পড়াশোনা, সামাজিক মেলামেশা বা বিনোদন—সেগুলোর অনেকটাই কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরক্তি সবসময় খারাপ নয়। এটি মানুষকে নতুন কিছু খুঁজতে, নতুন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই বিরক্তির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নতুন করে ভাবার সময়
একসময় যে অনুভূতিকে মানুষ এড়িয়ে চলতে চাইত, এখন সেটিকেই নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিরক্তি হয়তো কষ্টদায়ক, কিন্তু সেটিই মানুষকে চিন্তা করতে, সৃষ্টি করতে এবং এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে, হয়তো আমাদের আবারও বিরক্তির গুরুত্ব বুঝতে হবে—কারণ কখনও কখনও, কিছু না করার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় ভাবনার সূচনা।
ব্রিটেনে বিরক্তি কমছে, কিন্তু সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে অন্য মানসিক চাপ। এই পরিবর্তন সমাজকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিরক্তির হার কমলেও, তার প্রয়োজনীয়তা কিন্তু এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















