বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কিন্তু এই সংকটের কেন্দ্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তা হলো—শিক্ষকের মান। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার সবচেয়ে কম বাংলাদেশেই । এই বাস্তবতা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা।
শিক্ষকের দক্ষতার প্রকৃত চিত্র
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে দক্ষ বলতে হলে দুটি বিষয় জরুরি—সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা। এই মানদণ্ডে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হার মাত্র ৫৫ শতাংশের মতো । অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষকই পূর্ণ দক্ষতার মানদণ্ডে পড়েন না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাস্তব চিত্র এই পরিসংখ্যানের চেয়েও খারাপ। অনেক শিক্ষক কাগজে-কলমে যোগ্য হলেও শ্রেণীকক্ষে সেই দক্ষতার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা
শিক্ষকের মান খারাপ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিয়োগে অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ।
বিশেষ করে অতীতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সময় এই অনিয়ম আরও বেশি ছিল। এমনকি ভুয়া সনদ ব্যবহার করেও শিক্ষক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে শুরু থেকেই ব্যবস্থাটি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়।
প্রশিক্ষণের নামে প্রহসন
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকলেও তা অনেক সময় কার্যকর হয় না। কারণ প্রশিক্ষণের জন্য প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পাঠানো হয় না। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হয়, ফলে গণিতের প্রশিক্ষণে অংশ নেন বাংলা শিক্ষক বা অন্য বিষয়ের শিক্ষক ।
এতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তার কোনো প্রভাব পড়ে না। ফলে শিক্ষকরা আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেন না।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের মারাত্মক সংকট
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ে এই সংকট ভয়াবহ।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের একটি বড় অংশ উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেননি । একইভাবে গণিত শিক্ষকদের বড় অংশেরও বিষয়ভিত্তিক উচ্চতর জ্ঞান নেই। ফলে তারা গভীরভাবে বিষয়টি শেখাতে পারেন না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ভুল বা অসম্পূর্ণ জ্ঞানের কারণে শিক্ষার্থীরা মৌলিক ধারণাতেই দুর্বল থেকে যায়।

শ্রেণীকক্ষের বাস্তবতা
বাংলাদেশের অনেক স্কুলে একজন শিক্ষকের সামনে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকে । এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের দিকে নজর দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
ফলে শিক্ষক যতই দক্ষ হোন না কেন, বাস্তব পরিবেশে কার্যকর শিক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর যখন শিক্ষক নিজেই পর্যাপ্ত দক্ষ নন, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়।
পেশাগত মর্যাদা ও আকর্ষণের অভাব
শিক্ষকতা পেশা একসময় সমাজে অত্যন্ত সম্মানজনক ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই মর্যাদা অনেকটাই কমে গেছে। পর্যাপ্ত বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের অভাবের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন না ।
ফলে যারা শিক্ষক হচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশ বিকল্প সুযোগ না পেয়ে এই পেশায় আসছেন—যা মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। শিক্ষক তৈরি, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক ও কার্যকর পরিকল্পনা নেই।
অনেক সময় প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু তা টেকসই হয় না। ফলে সমস্যার মূল জায়গাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।
সমাধানের পথ কোথায়
এই সংকট থেকে বের হতে হলে প্রথমেই শিক্ষক নিয়োগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে শিক্ষকরা বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে পারেন।
শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত কমানো জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। কারণ একটি দেশের শিক্ষার মান নির্ভর করে তার শিক্ষকের মানের ওপর। আর দক্ষ শিক্ষক ছাড়া উন্নত শিক্ষা কখনোই সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















