বিশ্বকাপ মানেই বৈশ্বিক উন্মাদনা। কয়েক সপ্তাহের জন্য পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভুলে ফুটবলের উৎসবে মেতে ওঠে। কিন্তু যখন একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে, রাষ্ট্রগুলো সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—খেলাধুলা কি সত্যিই রাজনীতির ঊর্ধ্বে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। তবে বর্তমান বিশ্বকাপকে ঘিরে এটি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ মাঠের বাইরের বাস্তবতা যত জটিল হচ্ছে, মাঠের ভেতরের গল্পগুলো তত বেশি জায়গা দখল করছে জনপরিসরে। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, স্টেডিয়ামের জৌলুস, টিকিটের চাহিদা কিংবা তারকাদের উপস্থিতি নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মানবিক সংকট নিয়ে ততটা আলোচনা দেখা যাচ্ছে না।
বড় ক্রীড়া আসরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কেবল খেলার প্রতিযোগিতা নয়; এগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিরও প্রদর্শনী। বিশ্বকাপের মতো একটি আয়োজন রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গঠন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই এমন আসরকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।
এখানে ক্রীড়া সাংবাদিকতার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু খেলার ফলাফল জানানো নয়; বরং সেই খেলার সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর বাস্তবতাকেও সামনে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বড় টুর্নামেন্টের সময় অনেক সংবাদমাধ্যম সমালোচনামূলক অবস্থানের পরিবর্তে উৎসবমুখর বর্ণনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে সম্প্রচার স্বার্থ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিশেষ প্রবেশাধিকার এবং পেশাগত সুযোগের মতো নানা কারণ।
ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে বিশ্বকাপকে ঘিরে উচ্ছ্বাস বাড়তে থাকে, কিন্তু একই সময়ে চলমান আন্তর্জাতিক সংকটগুলো জনআলোচনার প্রান্তে সরে যায়। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক বিপর্যয় কিংবা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মতো বিষয়গুলো হঠাৎ করেই কম দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

অবশ্য দর্শকদেরও দোষ দেওয়া সহজ নয়। খেলাধুলা মানুষের জন্য আনন্দের, স্বস্তির এবং সম্মিলিত আবেগের একটি বিরল ক্ষেত্র। বিশ্বকাপ এমন একটি মুহূর্ত, যখন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ একই আবেগে একত্রিত হয়। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন এই আনন্দকে ব্যবহার করে বাস্তব বিশ্বের কঠিন প্রশ্নগুলোকে আড়াল করা হয়।
নিরাপত্তার প্রশ্নও এবার উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে থাকে। লক্ষাধিক দর্শক, হাজারো সাংবাদিক এবং বৈশ্বিক সম্প্রচারের কারণে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি একটি প্রতীকী আন্তর্জাতিক মঞ্চ। ফলে নিরাপত্তা উদ্বেগও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি নিরাপত্তা নয়, সচেতনতা। আমরা কি বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারি এবং একই সঙ্গে বিশ্বের চলমান সংকটগুলো সম্পর্কেও সজাগ থাকতে পারি? নাকি ক্রীড়া বিনোদনের প্রবল স্রোত আমাদের সেই বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়?
খেলাধুলার সৌন্দর্য তার ঐক্য সৃষ্টির ক্ষমতায়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য আরও অর্থবহ হয় তখনই, যখন আমরা স্বীকার করি যে মাঠের বাইরের পৃথিবীও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দ দিতে পারে, অনুপ্রাণিত করতে পারে, এমনকি সাময়িক স্বস্তিও দিতে পারে। কিন্তু তা যেন আমাদের স্মৃতি, বিবেক কিংবা প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে মুছে না দেয়।
কারণ ফুটবল নব্বই মিনিটের খেলা হতে পারে, কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী অনেক বড়। আর সেই পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে কোনো বিশ্বকাপই পুরোপুরি আলাদা নয়।
মার্টিন জে 



















