০৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
সৌদি সফরে যাচ্ছেন শেহবাজ শরিফ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পর নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ মিয়ানমারে নিহত তিন ভারতীয় নাগরিকের প্রকৃত পরিচয় কি ? কোচেল্লায় ভুল বোঝাবুঝি, আরবি উল্লাসকে ব্যঙ্গ—শেষে ক্ষমা চাইলেন সাবরিনা কার্পেন্টার ‘হরমুজ প্রণালী অবরোধ’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জাপান ট্রাম্পের ‘শান্তির চুক্তিকারী’ আসলে কতটা কার্যকর : শান্তি আর ব্যবসার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই এক লাখ ডলারের ভিসা ফি: মার্কিন চাকরির বাজারে নতুন বাধা, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয়ে ধাক্কা: জ্বালানির দাম বাড়ায় নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের ট্রাম্পের আক্রমণের জবাবে পোপ লিও চতুর্দশ: “ভয় নেই, সত্য বলতেই এসেছি” তেলের আসল দাম কোনটি: বাজারে বিভ্রান্তি, বাস্তবে সংকট আরও গভীর দশকের পর দশক ধরে সুরের জাদু ছড়িয়ে গেছেন আশা ভোঁসলে

ক্ষমতা, আধ্যাত্মিকতা ও রাজনৈতিক নাটক: রাজনীতিতে জাভানিজ দর্শনের সংকট

ইন্দোনেশিয়ার শাসনব্যবস্থায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাভানিজ আধ্যাত্মিক দর্শন একটি অদৃশ্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে। এই দর্শনের মূল ছিল নৈতিকতা, ভারসাম্য এবং দায়িত্ববোধ। তবে বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই গভীর দর্শন অনেকটাই খোলসসর্বস্ব হয়ে গেছে এবং তার জায়গা নিয়েছে রাজনৈতিক নাটক, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতীকী প্রদর্শন।

নৈতিকতা থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা
গবেষক ডি. নিকি ফাহরিজাল জানান, জাভানিজ আধ্যাত্মিকতার মূল শিক্ষা ছিল অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা এড়িয়ে চলা এবং সংযম বজায় রাখা। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে সেই মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে অনেক নেতা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এতে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জাভানিজ সংস্কৃতিতে শেখানো হয় প্রকৃতি, মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে। কিন্তু অতিরিক্ত উন্নয়নকেন্দ্রিক নীতি সেই ভারসাম্য নষ্ট করছে, যার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে এবং এর ক্ষতি বহন করছে সাধারণ মানুষ।

Javanese Supremacy and the Politics of Culture in Indonesia: From Wayang to  Pancasila - KBA13 INSIGHT

কেদিরি শহর ও ‘অভিশাপ’ বিশ্বাস
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার কেদিরি শহরকে ঘিরে একটি পুরনো বিশ্বাস রয়েছে, যেখানে বলা হয়—দুর্নীতিগ্রস্ত বা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো নেতা এই শহরে প্রবেশ করলে তার পতন অনিবার্য। এই ধারণার উৎস একটি প্রাচীন গ্রন্থ, কালিঙ্গা ধর্মশাস্ত্র।

এই বিশ্বাসের উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট সুসিলো বামবাং ইউধোইয়োনো তার ক্ষমতায় থাকার সময় কেদিরি শহরে সরাসরি প্রবেশ করেননি। আবার ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময়ও কোনো প্রার্থী সেখানে প্রচার চালাননি। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট গিবরান রাখাবুমিং রাকার একটি নির্ধারিত প্রচারসভাও বাতিল করা হয় এই বিশ্বাসের কারণে।

অনেকে দাবি করেন, যারা কেদিরি সফর করেছেন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ক্ষমতা হারিয়েছেন। এই ঘটনাগুলোকে অনেকে অভিশাপের প্রমাণ হিসেবে দেখেন, যদিও এটি যুক্তির বাইরে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস।

মিথ, প্রতীক ও রাজনৈতিক কৌশল
সমালোচকদের মতে, জাভানিজ মূল্যবোধ এখন অনেক ক্ষেত্রেই কেবল প্রতীকী হয়ে গেছে এবং তা রাজনৈতিক ইমেজ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইমাম মুবারোক বলেন, মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুই দিকই থাকে এবং জীবনের মূল শিক্ষা হলো এই ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু রাজনীতিতে সেই ভারসাম্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সিংকল’ নামে একটি প্রতীকী উপায় ব্যবহার করে এই অভিশাপকে নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করা হয়, যা দেখায় কীভাবে এই ধরনের বিশ্বাসকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়।

How the mores of Indonesia's biggest ethnic group shape its politics

বিশ্বাস বনাম বাস্তব রাজনীতি
সাংস্কৃতিক কর্মী নুর আরিফ মনে করেন, এই ধরনের রহস্যময় বিশ্বাস আসলে রাজনীতিবিদদের চরিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়। তার মতে, প্রকৃত সততা যাচাই করতে চাইলে নেতাদের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং তাদের সাহস ও আচরণ লক্ষ্য করা উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন হয়ে উঠেছে, যেখানে দক্ষতার বদলে সম্পর্ক ও আনুগত্যই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপসংহার
ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে জাভানিজ আধ্যাত্মিক দর্শন একসময় নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন সেই দর্শন অনেক ক্ষেত্রে কেবল বাহ্যিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ। ফলে নৈতিকতা, ভারসাম্য ও দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা ছিল, তা পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি সফরে যাচ্ছেন শেহবাজ শরিফ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পর নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

ক্ষমতা, আধ্যাত্মিকতা ও রাজনৈতিক নাটক: রাজনীতিতে জাভানিজ দর্শনের সংকট

০৪:৪২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার শাসনব্যবস্থায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাভানিজ আধ্যাত্মিক দর্শন একটি অদৃশ্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে। এই দর্শনের মূল ছিল নৈতিকতা, ভারসাম্য এবং দায়িত্ববোধ। তবে বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই গভীর দর্শন অনেকটাই খোলসসর্বস্ব হয়ে গেছে এবং তার জায়গা নিয়েছে রাজনৈতিক নাটক, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতীকী প্রদর্শন।

নৈতিকতা থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা
গবেষক ডি. নিকি ফাহরিজাল জানান, জাভানিজ আধ্যাত্মিকতার মূল শিক্ষা ছিল অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা এড়িয়ে চলা এবং সংযম বজায় রাখা। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে সেই মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে অনেক নেতা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এতে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জাভানিজ সংস্কৃতিতে শেখানো হয় প্রকৃতি, মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে। কিন্তু অতিরিক্ত উন্নয়নকেন্দ্রিক নীতি সেই ভারসাম্য নষ্ট করছে, যার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে এবং এর ক্ষতি বহন করছে সাধারণ মানুষ।

Javanese Supremacy and the Politics of Culture in Indonesia: From Wayang to  Pancasila - KBA13 INSIGHT

কেদিরি শহর ও ‘অভিশাপ’ বিশ্বাস
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার কেদিরি শহরকে ঘিরে একটি পুরনো বিশ্বাস রয়েছে, যেখানে বলা হয়—দুর্নীতিগ্রস্ত বা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো নেতা এই শহরে প্রবেশ করলে তার পতন অনিবার্য। এই ধারণার উৎস একটি প্রাচীন গ্রন্থ, কালিঙ্গা ধর্মশাস্ত্র।

এই বিশ্বাসের উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট সুসিলো বামবাং ইউধোইয়োনো তার ক্ষমতায় থাকার সময় কেদিরি শহরে সরাসরি প্রবেশ করেননি। আবার ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময়ও কোনো প্রার্থী সেখানে প্রচার চালাননি। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট গিবরান রাখাবুমিং রাকার একটি নির্ধারিত প্রচারসভাও বাতিল করা হয় এই বিশ্বাসের কারণে।

অনেকে দাবি করেন, যারা কেদিরি সফর করেছেন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ক্ষমতা হারিয়েছেন। এই ঘটনাগুলোকে অনেকে অভিশাপের প্রমাণ হিসেবে দেখেন, যদিও এটি যুক্তির বাইরে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস।

মিথ, প্রতীক ও রাজনৈতিক কৌশল
সমালোচকদের মতে, জাভানিজ মূল্যবোধ এখন অনেক ক্ষেত্রেই কেবল প্রতীকী হয়ে গেছে এবং তা রাজনৈতিক ইমেজ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইমাম মুবারোক বলেন, মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুই দিকই থাকে এবং জীবনের মূল শিক্ষা হলো এই ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু রাজনীতিতে সেই ভারসাম্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সিংকল’ নামে একটি প্রতীকী উপায় ব্যবহার করে এই অভিশাপকে নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করা হয়, যা দেখায় কীভাবে এই ধরনের বিশ্বাসকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়।

How the mores of Indonesia's biggest ethnic group shape its politics

বিশ্বাস বনাম বাস্তব রাজনীতি
সাংস্কৃতিক কর্মী নুর আরিফ মনে করেন, এই ধরনের রহস্যময় বিশ্বাস আসলে রাজনীতিবিদদের চরিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়। তার মতে, প্রকৃত সততা যাচাই করতে চাইলে নেতাদের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং তাদের সাহস ও আচরণ লক্ষ্য করা উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন হয়ে উঠেছে, যেখানে দক্ষতার বদলে সম্পর্ক ও আনুগত্যই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপসংহার
ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে জাভানিজ আধ্যাত্মিক দর্শন একসময় নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন সেই দর্শন অনেক ক্ষেত্রে কেবল বাহ্যিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ। ফলে নৈতিকতা, ভারসাম্য ও দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা ছিল, তা পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।