০২:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
ভারতের কফি বিপ্লব: বিশেষায়িত কফির উত্থানে বদলে যাচ্ছে চাষিদের ভবিষ্যৎ ট্রাম্প কি মধ্যবর্তী নির্বাচন জিততে চান, নাকি রিপাবলিকান পার্টির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই তাঁর আসল লক্ষ্য? ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়ার পর্যটন খাতে নতুন সংকট, ভ্রমণ ব্যয় বাড়ায় কমছে পর্যটক মার্সিয়া লুকাস আর নেই: ‘স্টার ওয়ার্স’-এর সাফল্যের নেপথ্যের কিংবদন্তি সম্পাদক মারা গেলেন ৮০ বছর বয়সে ২০৩৫ সালের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে চাপের মুখে যুক্তরাজ্য, উদ্বিগ্ন জাপান ও ইতালি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ধীরগতির ইরান আলোচনা, প্রয়োজনে ‘ভিন্ন পথে’ সমাধানের ইঙ্গিত দীর্ঘ সময় চার্জে রাখা ফোনের ঝুঁকি কতটা? মানিকগঞ্জে পারিবারিক বিরোধে ভাশুরের হামলা, নিহত ভাবি ও দেড় বছরের শিশু দিল্লিতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শোনা যাচ্ছে আর্তচিৎকার উড়োজাহাজ ভাড়ার সংকট: জ্বালানি নয়, আসল সমস্যা বাজারের কাঠামো

মিয়ানমারে নিহত তিন ভারতীয় নাগরিকের প্রকৃত পরিচয় কি ?

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে এক অস্বাভাবিক ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

চিন রাজ্যের টেডিম এলাকায় গত ১৭ মার্চ এই তিনজনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখে পিপলস ডিফেন্স আর্মি (পিডিএ) নামের একটি গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠী তাদের আটক করে। টেডিম শহরটি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তবর্তী জোখাওথার থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে জোমি সম্প্রদায়ের বসবাস।

পিডিএর এক শীর্ষ সদস্য জানান, আটক করার পর তাদের একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়। সেসব নথি থেকে নিহতদের পরিচয় জানা যায়—আফতার হোসেন মজুমদার, জাহাঙ্গীর মির্জা এবং আরফিক রহমান খান। মজুমদার ও মির্জা ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় এলাকার বাসিন্দা, আর খান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা।

তারা একটি সাদা এসইউভি গাড়িতে করে মিজোরাম থেকে টেডিমে প্রবেশ করেছিলেন। পিডিএ ওই গাড়িটিও জব্দ করে।

ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রথমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অসুবিধা হয়। তারা মিজো বা ইংরেজি ভাষা জানতেন না এবং এলাকার ভূপ্রকৃতি বা পরিস্থিতি সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না। পরে মিজোরাম থেকে একজন অনুবাদক এনে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

Three Indian Nationals Killed in Myanmar Civil War – The Diplomat

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা জানায়, তারা টেডিম এলাকায় বালিশ ও গদি বিক্রির সম্ভাবনা যাচাই করতে এসেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পিডিএ সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাদের গাড়ি জব্দ রেখে পরদিন সীমান্তে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।

২০ মার্চ তাদের একটি নিরাপদ ঘর থেকে সরিয়ে টেডিম ও টনজাং এলাকার মাঝামাঝি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত পিডিএর একটি শিবিরে নেওয়া হয়। ২২ মার্চ ভোরের দিকে প্রায় ৩০ জনের একটি সশস্ত্র দল, যারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য, ওই শিবিরে হামলা চালায়।

দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় আধাঘণ্টা গুলিবিনিময় হয়। গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে পিডিএ সদস্যরা সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং তিন ভারতীয় নাগরিক শিবিরেই থেকে যান। হামলাকারীরা শিবিরটি দখল করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দুপুরের দিকে এলাকা ত্যাগ করে।

পরদিন পিডিএ সদস্যরা ফিরে এসে ধ্বংসপ্রাপ্ত শিবির থেকে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

পিডিএর অভিযোগ, হামলাকারীরা তিনজনকে নির্যাতনের পর কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। প্রাপ্ত ছবিতে দেখা গেছে, অন্তত একজনের পা কেটে ফেলার পর তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে অন্য একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সদস্যদের মতে, দুজন গুলির লড়াইয়ে নিহত হয়ে থাকতে পারে এবং তৃতীয়জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আগে থেকেই গুজব ছিল, ভারত থেকে কিছু লোক মিয়ানমারে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের একজন বাসিন্দার উপস্থিতি এবং মিজোরামে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত অনুমতিপত্রে ভুয়া ফোন নম্বর দেওয়ার ঘটনা এই সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

সাধারণত ভারতের সীমান্তবর্তী চারটি রাজ্য—মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ—ছাড়া অন্য অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের মিয়ানমারে প্রবেশের ঘটনা খুবই বিরল। ২০২২ সালে মণিপুরের মোরেহ এলাকা থেকে দুই ভারতীয় নাগরিক মিয়ানমারের তামু এলাকায় নিহত হয়েছিলেন, যাদের হত্যার পেছনে ব্যবসায়িক বিরোধের সন্দেহ করা হয়েছিল।

এই সর্বশেষ ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিকের উদ্দেশ্য এখনও রহস্যই রয়ে গেছে। তবে এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় বাইরের মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যার কিছু বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের কফি বিপ্লব: বিশেষায়িত কফির উত্থানে বদলে যাচ্ছে চাষিদের ভবিষ্যৎ

মিয়ানমারে নিহত তিন ভারতীয় নাগরিকের প্রকৃত পরিচয় কি ?

০৬:৪৭:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে এক অস্বাভাবিক ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

চিন রাজ্যের টেডিম এলাকায় গত ১৭ মার্চ এই তিনজনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখে পিপলস ডিফেন্স আর্মি (পিডিএ) নামের একটি গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠী তাদের আটক করে। টেডিম শহরটি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তবর্তী জোখাওথার থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে জোমি সম্প্রদায়ের বসবাস।

পিডিএর এক শীর্ষ সদস্য জানান, আটক করার পর তাদের একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়। সেসব নথি থেকে নিহতদের পরিচয় জানা যায়—আফতার হোসেন মজুমদার, জাহাঙ্গীর মির্জা এবং আরফিক রহমান খান। মজুমদার ও মির্জা ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় এলাকার বাসিন্দা, আর খান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা।

তারা একটি সাদা এসইউভি গাড়িতে করে মিজোরাম থেকে টেডিমে প্রবেশ করেছিলেন। পিডিএ ওই গাড়িটিও জব্দ করে।

ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রথমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অসুবিধা হয়। তারা মিজো বা ইংরেজি ভাষা জানতেন না এবং এলাকার ভূপ্রকৃতি বা পরিস্থিতি সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না। পরে মিজোরাম থেকে একজন অনুবাদক এনে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

Three Indian Nationals Killed in Myanmar Civil War – The Diplomat

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা জানায়, তারা টেডিম এলাকায় বালিশ ও গদি বিক্রির সম্ভাবনা যাচাই করতে এসেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পিডিএ সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাদের গাড়ি জব্দ রেখে পরদিন সীমান্তে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।

২০ মার্চ তাদের একটি নিরাপদ ঘর থেকে সরিয়ে টেডিম ও টনজাং এলাকার মাঝামাঝি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত পিডিএর একটি শিবিরে নেওয়া হয়। ২২ মার্চ ভোরের দিকে প্রায় ৩০ জনের একটি সশস্ত্র দল, যারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য, ওই শিবিরে হামলা চালায়।

দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় আধাঘণ্টা গুলিবিনিময় হয়। গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে পিডিএ সদস্যরা সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং তিন ভারতীয় নাগরিক শিবিরেই থেকে যান। হামলাকারীরা শিবিরটি দখল করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দুপুরের দিকে এলাকা ত্যাগ করে।

পরদিন পিডিএ সদস্যরা ফিরে এসে ধ্বংসপ্রাপ্ত শিবির থেকে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

পিডিএর অভিযোগ, হামলাকারীরা তিনজনকে নির্যাতনের পর কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। প্রাপ্ত ছবিতে দেখা গেছে, অন্তত একজনের পা কেটে ফেলার পর তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে অন্য একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সদস্যদের মতে, দুজন গুলির লড়াইয়ে নিহত হয়ে থাকতে পারে এবং তৃতীয়জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আগে থেকেই গুজব ছিল, ভারত থেকে কিছু লোক মিয়ানমারে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের একজন বাসিন্দার উপস্থিতি এবং মিজোরামে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত অনুমতিপত্রে ভুয়া ফোন নম্বর দেওয়ার ঘটনা এই সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

সাধারণত ভারতের সীমান্তবর্তী চারটি রাজ্য—মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ—ছাড়া অন্য অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের মিয়ানমারে প্রবেশের ঘটনা খুবই বিরল। ২০২২ সালে মণিপুরের মোরেহ এলাকা থেকে দুই ভারতীয় নাগরিক মিয়ানমারের তামু এলাকায় নিহত হয়েছিলেন, যাদের হত্যার পেছনে ব্যবসায়িক বিরোধের সন্দেহ করা হয়েছিল।

এই সর্বশেষ ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিকের উদ্দেশ্য এখনও রহস্যই রয়ে গেছে। তবে এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় বাইরের মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যার কিছু বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।