কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের পথে থাকা এশিয়ার পর্যটন খাত আবারও নতুন ধাক্কার মুখে পড়েছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটননির্ভর অর্থনীতিগুলোতে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বিমান ভাড়ার উল্লম্ফন এবং ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্নের কারণে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে পর্যটক চাহিদা কমতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাত এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হওয়ার আগেই এই নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বহু দেশের অর্থনীতি ও লাখো মানুষের জীবিকায় চাপ বাড়ছে।
পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির উদ্বেগ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থাইল্যান্ডের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ, ভিয়েতনামের প্রায় ৯ শতাংশ পর্যটন খাত থেকে আসে। কম্বোডিয়ায় এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান।
এছাড়া ফিলিপাইন ও নেপালের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পর্যটন বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে পর্যটক সংখ্যা কমে গেলে এসব দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং আগে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীল নৌপথের সুবিধা পেত, তারা এখন অতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই নতুন এই সংকট পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
বিমান সংস্থাগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি
জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য এবং সরবরাহজনিত চাপের কারণে কয়েকটি বড় এশীয় বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট কমিয়েছে বা সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী অনেক ফ্লাইটকে এখন দীর্ঘতর রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ওপর। মাঝারি ও দীর্ঘ দূরত্বের রুটে জ্বালানি সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে বিমান টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনিশ্চয়তার কারণে অনেক যাত্রী শেষ মুহূর্তে টিকিট বুক করছেন, যা বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করছে।
ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করছেন অনেকে
উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক পর্যটক তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে থাইল্যান্ড ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন এমন অনেক পর্যটক বিমান ভাড়া দেখে সিদ্ধান্ত বদলেছেন।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষ এখন কম খরচের বিকল্প খুঁজছেন অথবা পুরো ভ্রমণই বাতিল করছেন। ভিয়েতনামের হোটেল খাতেও দেখা যাচ্ছে, পর্যটকেরা আগের তুলনায় সস্তা আবাসন বেছে নিচ্ছেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমজীবীদের সংকট
পর্যটননির্ভর শহরগুলোতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপে পর্যটক কমে যাওয়ায় টুকটুক চালকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেকের দৈনিক আয় আগের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
একই সঙ্গে গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁ এবং ছোট ব্যবসাগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতেও শঙ্কা
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পর্যটক চাহিদা হ্রাস এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে। মহামারির আগে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশই আসত পর্যটন খাত থেকে।
থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে পর্যটক আগমনে পতনের লক্ষণ দেখছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশটিতে মোট বিদেশি পর্যটক আগমন ৭ শতাংশ কমেছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত পর্যটকের সংখ্যায় আরও বড় পতন দেখা গেছে।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়লে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















