ভারতে কফি শুধু একটি পানীয় নয়, ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে উৎস, স্বাদ ও মানের গল্প। দেশের কফি শিল্পে এখন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে কফি মূলত পণ্য হিসেবে বিক্রি হতো, সেখানে এখন বিশেষায়িত বা ‘স্পেশালটি’ কফির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে উৎপাদক, রোস্টার এবং ভোক্তাদের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
বাড়ছে দেশীয় বাজার
ভারত তার মোট কফি উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি করে। তবে দেশীয় বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতি বছর কফি ব্যবহারের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ১৫ শতাংশেরও কম মানুষ নিয়মিত কফি পান করেন। ফলে ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিশাল।
শুধু উৎপাদন নয়, কফি কেনা-বেচার ধরনও বদলাচ্ছে। বড় আকারের বাণিজ্যের পরিবর্তে এখন ক্রেতারা সরাসরি খামার থেকে কফি সংগ্রহে আগ্রহী। এতে কফির উৎস, উৎপাদন পদ্ধতি এবং গুণমান সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
খামার থেকে সরাসরি কাপ পর্যন্ত
ভারতের বিশেষায়িত কফি খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ব্লু টোকাই এখন দেশের শতাধিক এস্টেটের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ কফি সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। একইভাবে মুম্বাইভিত্তিক সাবকো কফিও খামারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে কফির জাত, প্রক্রিয়াকরণ এবং স্বাদের উন্নয়নে কাজ করছে।
এই নতুন মডেলে কফির প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভোক্তারা জানতে পারছেন তাদের কাপে থাকা কফি কোন খামার থেকে এসেছে, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে এবং কারা এর পেছনে কাজ করেছেন।
একটি শতবর্ষী এস্টেটের রূপান্তর
তামিলনাড়ুর কোদাইকানালের থাডিয়ান কুডিসাই এস্টেট এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৮৮০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত এই এস্টেটের বর্তমান মালিক শেখর নাগারাজন পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রতিনিধি।

৪৪.৫ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই এস্টেটে প্রধানত অ্যারাবিকা কফি চাষ করা হয়। পাশাপাশি অ্যাভোকাডো, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, গোলমরিচ ও ম্যাকাডেমিয়া গাছও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি মাথায় রেখে এস্টেটে স্টেনোফাইলা ও লাইবেরিকার মতো বিরল কফি প্রজাতি নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
ফলনের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাদ
নাগারাজনের ভাষায়, আগে চাষিরা রোগ প্রতিরোধ ও ফলনের দিকে বেশি নজর দিতেন। এখন গুরুত্ব পাচ্ছে কফির স্বাদ ও মান। আন্তর্জাতিক ‘কাপিং স্কোর’ পদ্ধতিতে ৮০-এর বেশি নম্বর পাওয়া কফিকে বিশেষায়িত কফি হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই লক্ষ্য পূরণে এস্টেটে উন্নত মানের মাতৃগাছ নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত পরাগায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একটি কফি ফল পরিপক্ব হতে প্রায় ২৪০ দিন সময় লাগে, এরপর কয়েক মাস ধরে চলে সংগ্রহ প্রক্রিয়া।
জৈব পদ্ধতির দিকে ঝোঁক

এস্টেটটি রাসায়নিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করেছে। পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পঞ্চগব্য এবং ভার্মি-কম্পোস্টের মতো ঐতিহ্যবাহী জৈব সার। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কফির স্বাদেও ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি মালিকপক্ষের।
বিশেষ করে ইয়েলো বোর্বন জাতের কফি এখন এস্টেটটির অন্যতম আকর্ষণ। সীমিত পরিমাণে উৎপাদিত এই কফি উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় এবং মানসম্পন্ন কফির বাজারে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছে।
সামনের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে ভারতীয় কফি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ভোক্তারা এখন কফির উৎস, প্রক্রিয়াকরণ এবং মান সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। ফলে বিশেষায়িত কফির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে শিল্পটির সামনে শ্রমিক সংকট, যান্ত্রিকীকরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসব বাধা মোকাবিলা করা গেলে ভারতের কফি শিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে, যেখানে কফি আর শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, বরং একটি উচ্চমূল্যের কারুশিল্পভিত্তিক পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















