ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষ। তাদের জন্য নিরাপত্তার চেয়ে জীবিকা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এক শহরে দুই বাস্তবতা
দিল্লির ব্যস্ত বাজারগুলোতে এখন যেন দুটি ভিন্ন পৃথিবী দেখা যায়। একদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকান ও বিপণিবিতান, যেখানে মানুষ কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পায়। অন্যদিকে খোলা রাস্তায় রিকশাচালক, ফল বিক্রেতা, ঠেলাগাড়ি চালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তীব্র রোদ মাথায় নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুপুরের রোদে হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে উঠলেও লাখো শ্রমজীবী মানুষের সামনে কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। কাজ না করলে আয় নেই, আর আয় না হলে পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
গরমের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই
রিকশাচালক হরিশ চন্দ্র জানান, প্রতি বছরই গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে। সকাল থেকে কাজ শুরু করলেও দুপুরের পর শরীর আর সায় দিতে চায় না। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই।
একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ উমর। সম্প্রতি তীব্র গরমের কারণে তাকে একদিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এতে তার কয়েকশ রুপি আয় কমে যায়। কিন্তু পরিবারের খরচ তো আর থেমে থাকে না। ফলে সেই ক্ষতি মেটাতে হয় সঞ্চয় থেকে।
দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহের সময়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ, তীব্র ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। দিল্লির মতো বড় শহরগুলোতে কংক্রিটের বিস্তার, যানবাহনের তাপ এবং সবুজের অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা কয়েক সপ্তাহ ধরে ৪০ ডিগ্রির ওপরে রয়েছে। অনেক দিনই তা ৪৫ ডিগ্রি অতিক্রম করেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে কাজ করলে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, কিডনির সমস্যা এবং তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তারা সতর্ক করে বলছেন, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমিভাব বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
রাতেও মিলছে না স্বস্তি
সমস্যা শুধু দিনের নয়। দিল্লির অনেক শ্রমজীবী পরিবার টিন ও প্লাস্টিকের তৈরি ছোট ঘরে বাস করে। এসব ঘর দিনে তাপ শোষণ করে এবং রাতেও সেই গরম ছড়াতে থাকে।
ফলে রাতেও শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে পারে না। এতে দিনের পর দিন ক্লান্তি জমতে থাকে এবং অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
নারীদের কষ্ট আরও বেশি
অনেক নারী গৃহকর্মী বা স্বল্প আয়ের কাজে যুক্ত। তাদের বাইরে কাজ করার পাশাপাশি রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা এবং সংসারের অন্যান্য কাজও সামলাতে হয়।
এক নারী শ্রমিক জানান, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র গরমে তিনি কয়েকদিন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। অনেক বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে সকাল থেকেই কাপড় ভিজে যায় ঘামে। কখনও কখনও ছাদের কাজ করতে গেলে মেঝে এতটাই গরম থাকে যে সেখানে দাঁড়ানোও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
দিল্লির এই তাপপ্রবাহ আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের কাছে গরম থেকে বাঁচার সুযোগ সীমিত, কিন্তু জীবিকার প্রয়োজন তাদের প্রতিদিন রাস্তায় নামতে বাধ্য করছে।
দিল্লির তীব্র তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার তাগিদে ৪৫ ডিগ্রি গরমেও কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















