আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র বা রাসয়নিক হামলার কথাই বেশি উঠে আসে। কিন্তু এমন এক ধরনের অস্ত্র রয়েছে, যার ধ্বংসক্ষমতা অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানাও অতিক্রম করে—জীবাণু অস্ত্র। একটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা বিষাক্ত জৈব উপাদান সীমান্ত, সেনাবাহিনী কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান চেনে না। একবার ছড়িয়ে পড়লে তা গোটা মানবসমাজকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। এ কারণেই জীবাণু অস্ত্রকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অন্যতম বিপজ্জনক রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন বহু আগেই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে গৃহীত এবং ১৯৭৫ সালে কার্যকর হওয়া বায়োলজিক্যাল উইপনস কনভেনশন (Biological Weapons Convention) আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি ছিল প্রথম বহুপাক্ষিক চুক্তি, যা একটি সম্পূর্ণ শ্রেণির গণবিধ্বংসী অস্ত্রের উন্নয়ন, উৎপাদন, মজুত এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এর মূল দর্শন ছিল স্পষ্ট—জীববিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতি মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নয়।
তবে এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি জীবাণু বা বিষাক্ত উপাদানকে নিজে নিষিদ্ধ করেনি; নিষিদ্ধ করেছে সেগুলোর বৈরী বা সামরিক ব্যবহার। অর্থাৎ চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা প্রতিরক্ষামূলক সীমিত ব্যবহারের জন্য এসব উপাদান বৈধ। কিন্তু যদি একই উপাদানকে মানুষের ক্ষতি, যুদ্ধ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে উন্নয়ন, সংরক্ষণ বা পরিবহন করা হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এই ভারসাম্য বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তার অপব্যবহার রোধেরও চেষ্টা করে।
চুক্তির কার্যকারিতা জোরদার করতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনে রোগজীবাণু ও বিষাক্ত উপাদানের নিরাপদ সংরক্ষণ, জাতীয় পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সন্দেহজনক রোগের প্রাদুর্ভাব তদন্তে আন্তর্জাতিক সক্ষমতা বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এসব ব্যবস্থা কি বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তিত হুমকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে?
ইতিহাস বলছে, সংক্রামক রোগ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; অনেক সময় তা যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা ইচ্ছাকৃত ব্যবহারের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্লেগ, কলেরা, গুটিবসন্ত কিংবা অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগ মানবসভ্যতাকে বিপর্যস্ত করেছে। সামরিক ইতিহাসে এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে রোগকে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
মধ্যযুগে প্লেগে আক্রান্ত মৃতদেহ দুর্গের ভেতরে নিক্ষেপের ঘটনা ইতিহাসে উল্লেখিত। কলেরা সৃষ্টিকারী ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার গবেষণার অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। অ্যানথ্রাক্সের ঘটনাও দেখিয়েছে, অল্প পরিমাণ জীবাণু কীভাবে একটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর ঘটনায় ২২ জন আক্রান্ত হন এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়, কিন্তু দায়ী ব্যক্তিকে কখনো শনাক্ত করা যায়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোটুলিনাম টক্সিন ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা বিভিন্ন পক্ষ অর্জন করেছিল বলে জানা যায়, যদিও যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা ব্যবহার করা হয়নি। একইভাবে চীনের নিংবো অঞ্চলে প্লেগবাহী মাছি বহনকারী সিরামিক বোমা নিক্ষেপের অভিযোগ ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। কোরীয় যুদ্ধের সময়ও রোগবাহী পোকামাকড়, মাকড়সা ও ইঁদুর ব্যবহার করে প্লেগ, অ্যানথ্রাক্স, কলেরা, এনসেফালাইটিস ও মেনিনজাইটিস ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল। যদিও পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ওই অঞ্চলে আগে থেকেই বিদ্যমান রোগের বিস্তারই সংক্রমণ বৃদ্ধির বড় কারণ হতে পারে।
এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জীবাণু অস্ত্র নিয়ে অভিযোগ এবং বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ রোগের প্রাকৃতিক বিস্তার এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সবসময় সহজ নয়। আর এই অনিশ্চয়তাই বায়োসন্ত্রাসকে আরও জটিল নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে।
গত কয়েক দশকে ইবোলা, সার্স, মার্স এবং বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ বিশ্বকে বারবার সতর্ক করেছে যে একটি জীবাণু কত দ্রুত আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধ না থাকলেও বৈশ্বিক যোগাযোগ, বিমান পরিবহন এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগরজীবন সংক্রমণকে অভূতপূর্ব গতিতে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এই বাস্তবতায় কোভিড-১৯ মহামারি নতুন মাত্রা যোগ করে। মহামারির শুরু থেকেই ভাইরাসটির উৎপত্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে প্রথমদিকে জানানো হয়েছিল, চীনের উহানের একটি বন্যপ্রাণী বাজারে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়। চীনা বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছিলেন, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ভাইরাসের রূপান্তরের মাধ্যমেই সংক্রমণ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে পরীক্ষাগার থেকে দুর্ঘটনাবশত ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে আসে।
![]()
এদিকে মহামারির অল্প আগে অনুষ্ঠিত ‘ইভেন্ট ২০১’ নামের বৈশ্বিক মহামারি প্রস্তুতি মহড়াও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে আয়োজিত এই মহড়ায় বাদুড় থেকে শূকর হয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া একটি কাল্পনিক নতুন করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক প্রভাব অনুকরণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই মহড়াকে ঘিরে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছড়ালেও সেটি ছিল একটি পরিকল্পিত মহামারি প্রস্তুতি অনুশীলন।
কোভিড-১৯-এর উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক এখনও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি জীবাণু অস্ত্র ছিল, নাকি প্রাণী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর গবেষণাগারে অধ্যয়নের সময় নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে—এমন কোনো দাবিই এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে আলাদা করে মূল্যায়ন করাই যুক্তিসঙ্গত।
আন্তর্জাতিক আইন জীবাণু অস্ত্রকে নিষিদ্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা হলো বায়োলজিক্যাল উইপনস কনভেনশনে কার্যকর যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। ফলে কোনো রাষ্ট্র গোপনে চুক্তি লঙ্ঘন করছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন। একই সঙ্গে জৈবপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি যেমন চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতা, শক্তিশালী তদারকি এবং দ্রুত তদন্তের সক্ষমতা।
মানবসভ্যতা হয়তো এখনও সব যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু এমন অস্ত্রের বিরুদ্ধে ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব, যার লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সেনাবাহিনী নয়, বরং সমগ্র মানবজাতি। জীবাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সেই নৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সেই নীতিকে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া, যাতে জীববিজ্ঞান মানুষের জীবন রক্ষার শক্তি হয়ে থাকে, ধ্বংসের অস্ত্র নয়।
আমাদো তোলেন্তিনো জুনিয়র 

















