ইয়েমেনের হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন এক কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা কিংবা ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের ওপর চাপ বাড়লে এর প্রভাব পৌঁছাতে পারে বৈশ্বিক বাজারেও।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন এই সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পারস্য উপসাগরীয় উপকূল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পৌঁছে দেয় এই পাইপলাইন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৮০-এর দশকে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে সৌদি তেল রপ্তানিতে পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু পাইপলাইনে হামলা ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বিকল্প পথও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ
হামলার আগে বৈশ্বিক তেলের প্রায় ৫ শতাংশ এই পাইপলাইন দিয়ে পরিবহন করা হতো। পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত দ্রুত অগ্রসর হওয়ায় দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়।
এখানে শুধু পেট্রোলের দাম নয়, ডিজেলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, নির্মাণ ও দীর্ঘপথের পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ায়। ফলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দ্রুত বৃহত্তর মূল্যস্ফীতির সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো আগামী সপ্তাহের মধ্যে পাইপলাইনের অর্ধেক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আশা করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোপুরি মেরামত করতে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এমনকি মেরামতের পরও একই পাইপলাইনে আবার হামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইয়েমেনের এই সংঘাতকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখলে এর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বোঝা কঠিন। বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ।
হুথিদের হাতে প্রণালির কাছাকাছি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় সৌদি আরবের ওপর সামরিক চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে তারা উন্নত মার্কিন ও সৌদি সরবরাহ করা অস্ত্র হাতে পেয়েছে, যা বাণিজ্যিক জাহাজ ও আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর হামলার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও জড়িয়ে আছে। হুথিদের তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হলেও তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। তারা জাইদি মুসলিম এবং তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে। তবে তেহরানের সমর্থন পাওয়ায় সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে।
সৌদি-হুথি বিরোধের কেন্দ্রে ক্ষমতার প্রশ্ন
ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে হুথিদের রাজনৈতিক লক্ষ্য। তারা পুরো ইয়েমেন, এমনকি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব এমন কোনো প্রতিবেশী চায় না, যেখানে ইরানের ঘনিষ্ঠ একটি শিয়া নেতৃত্ব ক্ষমতায় থাকবে।
২০১৪ সালে বিদ্রোহ পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। পরের বছর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। সীমিতসংখ্যক সেনা পাঠানোর পাশাপাশি তারা হাজার হাজার বিমান হামলা চালায়। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে তারা ব্যর্থ হয়। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অংশগ্রহণ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ অবশ্য অব্যাহত থাকে।
গত এক বছরে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে, রিয়াদকে তার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আরও বড় অংশ নিজেকেই বহন করতে হবে। একই সময়ে ওয়াশিংটন হুথিদেরও ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা জাহাজ চলাচলে হামলা না চালালে গত বছরের মতো মার্কিন সামরিক অভিযান আবারও হবে না। সেই অভিযানও শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থায় গিয়ে থেমেছিল।
সমঝোতা নাকি সংঘাত বাড়ানো
সৌদি আরবের সামনে এখন মূলত দুটি পথ—সামরিক অভিযান বাড়ানো অথবা রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করা।
হুথিরা ইতিমধ্যে পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে এবং পরিখা খনন করছে। সৌদি আরবও নতুন দখল করা ভূখণ্ডের ওপরের উঁচু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে সেখানে থাকা সৌদি বাহিনীর বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা বাড়ে। এ সময় সৌদি বিমান হামলা জোরদার হয়েছে এবং তাদের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার একটি অসমর্থিত খবরও এসেছে।
গত এক দশকে সৌদি সামরিক অভিযানের দুর্বল ফলাফল বিবেচনায় নিলে সংঘাত বাড়ালেই সাফল্য নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে সৌদি আরবের দুর্বল হয়ে পড়া জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ডজন সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। ব্রিটেনও কয়েকজন উপদেষ্টা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনবে—এমন সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে হুথিরা সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। সানা বিমানবন্দর ও হোদেইদা বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর প্রতি সৌদি সমর্থন বন্ধ করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো দাবি তারা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব শর্ত মেনে নেওয়া সৌদি আরবের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে এবং হুথিদের একটি কৌশলগত বিজয় এনে দিতে পারে।
মিসরের পুরোনো অভিজ্ঞতা
সৌদি আরব আঞ্চলিক সহযোগীদের সহায়তা চাইতে পারে। তবে ইয়েমেনে সরাসরি সেনা পাঠানোর ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়ে অনেক দেশই সতর্ক থাকবে। মিসরের ইতিহাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মিসরীয় সেনা পাঠিয়েছিলেন। অন্তত ১০ হাজার সেনা আর দেশে ফেরেননি এবং মিসর কোনো অর্জন ছাড়াই সেখান থেকে ফিরে আসে। ইয়েমেন মিসরের জন্য একটি কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাই কায়রোর বর্তমান অবস্থানকে সতর্ক করেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বৈঠকের পর মিসরের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতেও ‘ইয়েমেন সংকটের একটি ব্যাপক ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে’ সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মিসর ইয়েমেনে ব্যর্থ হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যর্থ হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সৌদি আরবকে ইয়েমেনে আবারও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে সহায়তা করতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসা দেশের সংখ্যা কমই হবে। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব সংঘাত বাড়াবে না; তবে অতীতের অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের আরও সতর্ক করবে।
ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের সমস্যা নয়। সৌদি তেল অবকাঠামো, বাব আল-মান্দাবের সামুদ্রিক পথ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা একই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।
পূর্ব ও পশ্চিম হয়তো কখনো এক হবে না। তবে হুথিরা যদি ইয়েমেনের উত্তর ও দক্ষিণ, ‘অশ্রুর দ্বার’ নামে পরিচিত বাব আল-মান্দাব এবং তেলের দামের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে এই সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বহুদূর পৌঁছাতে পারে।
টিম মার্শাল 


















