বিশ্বের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো এমন এক প্রবৃদ্ধি-সংকটের মুখে পড়েছে, যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে তাদের আরও বড় ঝুঁকি নিতে হতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও নোভার্টিসের বাজারমূল্য থেকে সম্মিলিতভাবে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুছে গেছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে কোম্পানি দুটির অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণ বা মার্জার-অ্যাকুইজিশন কৌশল।
সমস্যাটি শুধু শেয়ারবাজারের মূল্যপতন নয়। বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিজেদের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে আগের তুলনায় কম ফল আসছে। একই সময়ে নতুন ওষুধের পাইপলাইনও ক্রমে পাতলা হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে তাদের বাইরের উদ্ভাবনী কোম্পানি, বিশেষ করে বায়োটেক প্রতিষ্ঠান কিনে নেওয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে নিজেদের গবেষণায় কাঙ্ক্ষিত হারে নতুন ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে ভালো সম্ভাবনাময় বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন ইতিমধ্যে অনেক বেশি। অর্থাৎ নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস কিনতে গেলে বড় কোম্পানিগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। সেই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দেবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই।
বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় নতুন ওষুধের ধারাবাহিক আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের বহুল বিক্রীত ওষুধের পেটেন্ট-সুরক্ষা শেষ হয়ে গেলে বিক্রি ও আয় কমে যেতে পারে। তখন নতুন ওষুধ বা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়। কিন্তু গবেষণা থেকে পর্যাপ্ত নতুন পণ্য না এলে কোম্পানিগুলোকে বাইরে তাকাতেই হয়।
বায়োটেক প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ তাই আপাতদৃষ্টিতে দ্রুত সমাধানের পথ হতে পারে। ছোট কোম্পানির হাতে থাকা পরীক্ষামূলক ওষুধ, নতুন প্রযুক্তি বা সম্ভাবনাময় গবেষণাকে বড় প্রতিষ্ঠানের অর্থ, গবেষণা অবকাঠামো ও বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এতে নতুন ওষুধ বাজারে আনার সময়ও কমতে পারে।
তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও বড়। কোনো সম্ভাবনাময় ওষুধ শেষ পর্যন্ত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নাও পেতে পারে কিংবা বাজারে প্রত্যাশিত চাহিদা তৈরি নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অধিগ্রহণে ব্যয় করা বিপুল অর্থের বিনিময়ে কোম্পানি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি পাবে না।
অন্যদিকে, বায়োটেক প্রতিষ্ঠানের দাম যদি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তাহলে অধিগ্রহণের সময় বড় কোম্পানিকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য আজই বেশি অর্থ দিতে হয়। এর ফলে চুক্তিটি সফল হলেও বিনিয়োগের ওপর প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও নোভার্টিসকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সাম্প্রতিক উদ্বেগ সেই বৃহত্তর সমস্যাটিকেই সামনে এনেছে—বিগ ফার্মার জন্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পথ ক্রমে কঠিন হচ্ছে। নিজেদের গবেষণায় ফল কমে গেলে অধিগ্রহণের প্রয়োজন বাড়ছে, কিন্তু সম্ভাবনাময় লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যও কম নয়। ফলে যে ওষুধ কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায়, তাদের সামনে একসঙ্গে দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—কেনার ঝুঁকি এবং না কেনার ঝুঁকি।
শেষ পর্যন্ত বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করাই সমাধান নয়। কোন প্রযুক্তি বা ওষুধের প্রকৃত সম্ভাবনা আছে, কোন বায়োটেক প্রতিষ্ঠানকে কত দামে কেনা যুক্তিযুক্ত এবং নিজেদের গবেষণা সক্ষমতা কীভাবে আবার শক্তিশালী করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ, বিগ ফার্মার বর্তমান অসুস্থতার সম্ভাব্য ওষুধ হয়তো অধিগ্রহণ। কিন্তু সেই ওষুধের মাত্রা ভুল হলে চিকিৎসার বদলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
Sarakhon Report 


















