পশ্চিমবঙ্গের বন, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বনিযুক্তি দপ্তরের মন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আদিবাসী সমাজের নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি ও জীবনধারার জন্য হুমকি। বিনপুর কেন্দ্র থেকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়ন হতে হবে স্থানীয় চাহিদা ও মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত থেকে, নয়তো তা টেকসই হবে না।
আদিবাসী পরিচয়ের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান
বিরবাহা হাঁসদা মনে করেন, আদিবাসীদের নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা, আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি তাদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। এই ঐতিহ্যই তাদের ইতিহাসকে জীবন্ত রাখে। তাঁর কথায়, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাপিয়ে দিলে সেই স্বাতন্ত্র্য হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তিনি এটিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন এবং এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসী জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাদের উপাসনা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন প্রকৃতিনির্ভর। ফলে এই জীবনধারাকে বদলে দেওয়ার যেকোনও প্রয়াস তাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

প্রতিনিধিত্ব ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব
মন্ত্রী হিসেবে নিজের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় কিছুটা হলেও বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় তিনি নিয়মিত আদিবাসীদের দাবি তুলে ধরেন, বিশেষ করে তাদের ধর্মীয় স্বীকৃতির বিষয়টি। পাশাপাশি ভুয়ো তফসিলি জনজাতি সনদের সমস্যার দিকেও তিনি নজর দিয়েছেন, যার ভিত্তিতে প্রশাসনকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিনপুরে প্রতিশ্রুতির ধরন
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা আলাদা। তিনি বলেন, আগে থেকে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া তাঁর ধরণ নয়। বরং এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে, তাদের প্রয়োজন বুঝে কাজ করাই তাঁর লক্ষ্য। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়াই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরির সংকট ও ছোট শিল্পের গুরুত্ব
পশ্চিমবঙ্গে চাকরির সংকট প্রসঙ্গে বিরবাহা হাঁসদা বলেন, এই সমস্যা শুধু রাজ্যে নয়, কেন্দ্রীয় স্তরেও রয়েছে। তাঁর মতে, বড় শিল্প সব সময় স্থানীয় মানুষকে কাজ দেয় না, কারণ বাইরে থেকে শ্রমিক আনা হয়। তাই ছোট ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ঘটালে কর্মসংস্থান আরও বিস্তৃত হবে। স্থানীয় সম্পদ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
নিজস্ব পরিচয়েই ভরসা
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিও তফসিলি জাতি ও জনজাতির প্রার্থী দিচ্ছে, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ এখনও তাঁকে নিজেদের একজন হিসেবেই দেখে। মন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন বদলাননি, সেটাই তাঁর বড় শক্তি।

মানুষ-হাতি সংঘাতের কারণ
ঝাড়গ্রামের মানুষ-হাতি সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি জানান, বনাঞ্চলে অতিরিক্ত নির্মাণ ও চাষাবাদের ফলে হাতির স্বাভাবিক বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। এতে হাতিরা আতঙ্কিত হয়ে জনবসতিতে ঢুকে পড়ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
জনগণের প্রধান চাহিদা
এলাকার মানুষের কাছ থেকে তিনি যে দাবিগুলো বেশি শুনছেন, তার মধ্যে রয়েছে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, বনভিত্তিক জীবিকার সুরক্ষা এবং স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রেখে এই সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসী পরিচয় ও ইউসিসি বিতর্ক নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। এই ইস্যু নির্বাচনের ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















