ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এখন বিশ্ব জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কড়াকড়ি আরোপ করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগামী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধের নির্দেশ দেন। এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির ফলে সীমিত কিছু জাহাজ চলাচল করলেও হুমকি ও অবরোধের কারণে ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে অনেক দিন তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে।
সমুদ্রপথের সংকীর্ণ গলিপথ কী
সমুদ্রপথের এমন কিছু সংকীর্ণ অংশ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের বড় অংশকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়। এসব জায়গাকে বলা হয় গলিপথ বা ‘চোকপয়েন্ট’। ভৌগোলিক গঠনের কারণে এখানে বিকল্প পথ থাকে না বললেই চলে। ফলে জাহাজ চলাচল এই সংকীর্ণ পথে কেন্দ্রীভূত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ তেল সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয় এবং তার বড় অংশই এই ধরনের গলিপথ দিয়ে যায়। ফলে কোনো একটি ঘটনায়ও সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানির দামে, পরিবহন ব্যয়ে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গলিপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালীকে ধরা হয়। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ দিয়েই উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রধান রপ্তানি সম্পন্ন হয়। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এর প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। শুধু অপরিশোধিত তেলই নয়, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে যায়। এর প্রায় ৮০ শতাংশই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে, ফলে ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এই পথের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গলিপথ
হরমুজের পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। মালাক্কা প্রণালী, বাব এল-মান্দেব প্রণালী, সুয়েজ খাল এবং পানামা খাল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
মালাক্কা প্রণালী মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মাঝ দিয়ে গেছে। এটি ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ, ফলে পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাব এল-মান্দেব প্রণালী আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত। এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার এবং এখান দিয়ে জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছায়। ফলে এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
সুয়েজ খাল মিশরের মধ্য দিয়ে কৃত্রিমভাবে নির্মিত একটি জলপথ, যা লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ এড়িয়ে সরাসরি যাতায়াত সম্ভব হয়।
পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এটি এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সহজ করে দিয়েছে, কারণ এতে দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল মূলত সমুদ্র আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদের অধীনে পরিচালিত হয়। এই আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত প্রণালীতে সব দেশের জাহাজ ও বিমান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচলের অধিকার রাখে, যাকে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বলা হয়। উপকূলবর্তী দেশগুলো নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে কিছু নিয়ম আরোপ করতে পারে, কিন্তু তারা জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে পারে না বা বেছে বেছে বাধা দিতে পারে না। তবে বাস্তবে এই অধিকার প্রয়োগ অনেক সময় নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের নৌক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর।
সংকটের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালীতে চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জলপথগুলো তাই শুধু ভৌগোলিক নয়, কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্বব্যাপী বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















