১০:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
হরমুজ খোলা বলছে ইরান, অবরোধ বহাল বলছে ট্রাম্প অপারেটরহীন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং: বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকা ৮,২২২ কোটি টাকার জ্বালানি স্বপ্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বরিশালে আওয়ামী লীগের হঠাৎ মিছিল, মুখ ঢেকে স্লোগান আইএমএফের কিস্তি আটকে কেন, বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ রাশেদ প্রধানের বাসভবনে হামলা নিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ রাষ্ট্রের স্বার্থেই সচেতন মানুষকে ১৭ এপ্রিল স্মরণ করতে হবে নাটোরে পুকুরে গোসল করতে নেমে দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া হাম আতঙ্কে দেশ: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২১১ মানিকগঞ্জে নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার ঘিরে গণপিটুনি, দুই ভাই নিহত ঝিনাইদহে চায়ের বাকি টাকা নিয়ে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১০

আইএমএফের কিস্তি আটকে কেন, বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণকর্মসূচি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ আপাতত চলমান কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না; বরং তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন শর্তে নতুন কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মূল অভিযোগ একটাই—বাংলাদেশ যেসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশেষ করে রাজস্ব, ব্যাংকিং, জ্বালানি ভর্তুকি ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায়, তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের এই কর্মসূচি নতুন নয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য ইসিএফ-ইএফএফ এবং আরএসএফ মিলিয়ে বড় একটি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করে। সেই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, সামাজিক সুরক্ষা বজায় রেখে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং জলবায়ু-সহনশীল বিনিয়োগে সহায়তা করা। আইএমএফের অফিসিয়াল নথি বলছে, বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে আরএসএফ সহায়তাও পেয়েছিল, আর শুরুতেই তাৎক্ষণিক অর্থছাড় হয়েছিল।

সমস্যা হলো, এই কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল কিছু কঠিন কিন্তু দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সংস্কার। আইএমএফের ২০২৩ সালের স্টাফ রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, কর্মসূচির বড় লক্ষ্য হলো রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাতকে শক্ত করা, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং নীতিনির্ধারণকে আরও আধুনিক ও বাজারসংগত করা। একই নথিতে রাজস্বখাতে অতিরিক্ত আয় তোলা, কর প্রশাসন আধুনিক করা, কর-ছাড় কমানো এবং জ্বালানি দামের ক্ষেত্রে সূত্রভিত্তিক সমন্বয় আনার কথা ছিল। গ্যাস ও বিদ্যুতের ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানোর কথাও সেখানে উল্লেখ ছিল।

আর্থিক খাতের সংষ্কার ব্যর্থতায় বাংলাদেশকে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি আইএমএফের

এখানেই এখন সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা। আইএমএফের ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ব্রিফিং ট্রান্সক্রিপ্টে সংস্থার এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিচের দিকের একটি এবং গত তিন বছর ধরে তা পিছলেছে। তিনি আরও বলেছেন, রাজস্ব, আর্থিক খাত পুনর্বাসন এবং বিনিময় হার সংস্কার—এই তিন স্তম্ভেই আরও অনেক কাজ বাকি। অর্থাৎ, আইএমএফের চোখে সমস্যাটি কেবল একটি বাজেট ঘাটতি বা একটি ব্যাংক বিল নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন।

রাজস্ব খাতের দুর্বলতাই সম্ভবত এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। আইএমএফের ২০২৬ সালের আর্টিকেল ফোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অর্থবছর ২০২৫-এ আরও নেমে গেছে। বোর্ডের পর্যবেক্ষণে দুর্বল রাজস্ব আহরণকে দেশের সামষ্টিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান বাধা বলা হয়েছে। তারা করব্যবস্থা সহজ করা, কর প্রশাসন শক্ত করা এবং কমপ্লায়েন্স বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। সহজ ভাষায়, আইএমএফ জানতে চাইছে—বাংলাদেশ যদি নিজের রাজস্বই যথেষ্ট তুলতে না পারে, তাহলে ব্যয়, ভর্তুকি, ব্যাংক উদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন কোথা থেকে হবে?

ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। ২০২৬ সালের আর্টিকেল ফোরে আইএমএফ বলেছে, ব্যাংকিং খাতের স্থিতি ফেরাতে আন্তর্জাতিক মানসম্মত একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল জরুরি। তাদের মতে, দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি কত, রাষ্ট্রীয় সহায়তা লাগবে কি না, পুনর্গঠন ও রেজল্যুশনের আইনি কাঠামো কতটা শক্ত—এসব বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা দরকার। একই সঙ্গে সিস্টেমিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সুশাসন এবং ব্যালান্সশিট স্বচ্ছতার কথাও তারা বলেছে। অর্থাৎ, শুধু আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়; আইএমএফ দেখতে চাইছে ব্যাংক বাঁচানোর কাঠামো বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্য।

বিনিময় হারও আরেকটি স্পর্শকাতর জায়গা। ২০২৪ সালের দ্বিতীয় পর্যালোচনা শেষে আইএমএফ স্বীকার করেছিল যে বাংলাদেশ কিছু “সাহসী” বিনিময় হার সংস্কার শুরু করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের মূল্যায়নে তারা আবারও বলেছে, নতুন বিনিময় হার কাঠামোর বাস্তবায়ন এখনো অসম্পূর্ণ, এবং পূর্ণ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জরুরি। এর মানে হলো, কাগজে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ঘোষণা করলেই আইএমএফ সন্তুষ্ট হচ্ছে না; তারা বাজারে আসল দর-গঠনের স্বাধীনতা, রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং নীতির ধারাবাহিকতা দেখতে চাইছে।

সংস্কারে ব্যর্থতা, আইএমএফের ঋণের কিস্তি স্থগিত

জ্বালানি ভর্তুকির প্রশ্নটিও এখন নতুন করে সামনে এসেছে। শুরু থেকেই আইএমএফের অবস্থান ছিল—পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত ভর্তুকি কমাতে হবে, তবে তার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা শক্ত করতে হবে। ২০২৩ সালের রিপোর্টে তারা বলেছিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশে উঠে গেছে এবং সূত্রভিত্তিক মূল্য সমন্বয় দরকার। এখন আন্তর্জাতিক তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় আবার বাড়ায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপও বেড়েছে। ফলে সরকার যদি একদিকে ভর্তুকি ধরে রাখে, অন্যদিকে রাজস্ব না বাড়ে, তবে বাজেটের ভেতরের চাপ দ্রুত তীব্র হবে—আইএমএফের অবস্থানকে এভাবেই পড়া যায়।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—চলমান কর্মসূচি টেনে নেওয়া হবে, নাকি নতুন শর্তে নতুন দরকষাকষি শুরু হবে? আইএমএফের মার্চ ২০২৬-এ ঢাকা সফরের পর দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশকে “ambitious policies and structural reforms” বা উচ্চাভিলাষী নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে যেতে হবে, এবং এপ্রিলের স্প্রিং মিটিংসে ‘best path forward’ খোঁজা হবে। অর্থাৎ দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; কিন্তু আইএমএফ স্পষ্ট করেছে, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী নতুন সরকারের জন্য এটাই কঠিন সংস্কারের উপযুক্ত সময়।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি দুটি। প্রথমত, অর্থ না এলে জ্বালানি আমদানি, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, বাজেট সহায়তা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থায় চাপ পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকার যদি সব শর্ত দ্রুত মানতে চায়, তাহলে কর বৃদ্ধি, ভর্তুকি সমন্বয়, ব্যাংক সংস্কার এবং বিনিময় হার বাস্তবায়নের সামাজিক ও রাজনৈতিক খরচও বাড়বে। তাই এটি কেবল অর্থ ছাড়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরের পুরোনো দুর্বলতার সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত।

সব মিলিয়ে ছবিটা হলো, আইএমএফ এখন বাংলাদেশকে সময় দিচ্ছে—কিন্তু ছাড় দিচ্ছে না। তারা বলছে, রাজস্ব বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং খাতের বাস্তব অবস্থা সামনে আনতে হবে, বিনিময় হার সংস্কারকে কাগজ থেকে বাজারে নামাতে হবে, আর ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করতে হবে। বাংলাদেশের সরকার যদি এই বার্তাকে কেবল ঋণকিস্তি জটিলতা হিসেবে দেখে, তাহলে সামনে আরও বড় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি এটিকে অর্থনীতির গভীর সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নেয়, তাহলে বর্তমান সংকটই নতুন সমঝোতার ভিত্তি হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ খোলা বলছে ইরান, অবরোধ বহাল বলছে ট্রাম্প

আইএমএফের কিস্তি আটকে কেন, বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ

০৮:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণকর্মসূচি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ আপাতত চলমান কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না; বরং তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন শর্তে নতুন কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মূল অভিযোগ একটাই—বাংলাদেশ যেসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশেষ করে রাজস্ব, ব্যাংকিং, জ্বালানি ভর্তুকি ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায়, তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের এই কর্মসূচি নতুন নয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য ইসিএফ-ইএফএফ এবং আরএসএফ মিলিয়ে বড় একটি সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করে। সেই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, সামাজিক সুরক্ষা বজায় রেখে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং জলবায়ু-সহনশীল বিনিয়োগে সহায়তা করা। আইএমএফের অফিসিয়াল নথি বলছে, বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে আরএসএফ সহায়তাও পেয়েছিল, আর শুরুতেই তাৎক্ষণিক অর্থছাড় হয়েছিল।

সমস্যা হলো, এই কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল কিছু কঠিন কিন্তু দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সংস্কার। আইএমএফের ২০২৩ সালের স্টাফ রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, কর্মসূচির বড় লক্ষ্য হলো রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাতকে শক্ত করা, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং নীতিনির্ধারণকে আরও আধুনিক ও বাজারসংগত করা। একই নথিতে রাজস্বখাতে অতিরিক্ত আয় তোলা, কর প্রশাসন আধুনিক করা, কর-ছাড় কমানো এবং জ্বালানি দামের ক্ষেত্রে সূত্রভিত্তিক সমন্বয় আনার কথা ছিল। গ্যাস ও বিদ্যুতের ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানোর কথাও সেখানে উল্লেখ ছিল।

আর্থিক খাতের সংষ্কার ব্যর্থতায় বাংলাদেশকে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি আইএমএফের

এখানেই এখন সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা। আইএমএফের ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ব্রিফিং ট্রান্সক্রিপ্টে সংস্থার এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিচের দিকের একটি এবং গত তিন বছর ধরে তা পিছলেছে। তিনি আরও বলেছেন, রাজস্ব, আর্থিক খাত পুনর্বাসন এবং বিনিময় হার সংস্কার—এই তিন স্তম্ভেই আরও অনেক কাজ বাকি। অর্থাৎ, আইএমএফের চোখে সমস্যাটি কেবল একটি বাজেট ঘাটতি বা একটি ব্যাংক বিল নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন।

রাজস্ব খাতের দুর্বলতাই সম্ভবত এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। আইএমএফের ২০২৬ সালের আর্টিকেল ফোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অর্থবছর ২০২৫-এ আরও নেমে গেছে। বোর্ডের পর্যবেক্ষণে দুর্বল রাজস্ব আহরণকে দেশের সামষ্টিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান বাধা বলা হয়েছে। তারা করব্যবস্থা সহজ করা, কর প্রশাসন শক্ত করা এবং কমপ্লায়েন্স বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। সহজ ভাষায়, আইএমএফ জানতে চাইছে—বাংলাদেশ যদি নিজের রাজস্বই যথেষ্ট তুলতে না পারে, তাহলে ব্যয়, ভর্তুকি, ব্যাংক উদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন কোথা থেকে হবে?

ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। ২০২৬ সালের আর্টিকেল ফোরে আইএমএফ বলেছে, ব্যাংকিং খাতের স্থিতি ফেরাতে আন্তর্জাতিক মানসম্মত একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল জরুরি। তাদের মতে, দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি কত, রাষ্ট্রীয় সহায়তা লাগবে কি না, পুনর্গঠন ও রেজল্যুশনের আইনি কাঠামো কতটা শক্ত—এসব বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা দরকার। একই সঙ্গে সিস্টেমিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সুশাসন এবং ব্যালান্সশিট স্বচ্ছতার কথাও তারা বলেছে। অর্থাৎ, শুধু আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়; আইএমএফ দেখতে চাইছে ব্যাংক বাঁচানোর কাঠামো বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্য।

বিনিময় হারও আরেকটি স্পর্শকাতর জায়গা। ২০২৪ সালের দ্বিতীয় পর্যালোচনা শেষে আইএমএফ স্বীকার করেছিল যে বাংলাদেশ কিছু “সাহসী” বিনিময় হার সংস্কার শুরু করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের মূল্যায়নে তারা আবারও বলেছে, নতুন বিনিময় হার কাঠামোর বাস্তবায়ন এখনো অসম্পূর্ণ, এবং পূর্ণ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জরুরি। এর মানে হলো, কাগজে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা ঘোষণা করলেই আইএমএফ সন্তুষ্ট হচ্ছে না; তারা বাজারে আসল দর-গঠনের স্বাধীনতা, রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং নীতির ধারাবাহিকতা দেখতে চাইছে।

সংস্কারে ব্যর্থতা, আইএমএফের ঋণের কিস্তি স্থগিত

জ্বালানি ভর্তুকির প্রশ্নটিও এখন নতুন করে সামনে এসেছে। শুরু থেকেই আইএমএফের অবস্থান ছিল—পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত ভর্তুকি কমাতে হবে, তবে তার সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা শক্ত করতে হবে। ২০২৩ সালের রিপোর্টে তারা বলেছিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশে উঠে গেছে এবং সূত্রভিত্তিক মূল্য সমন্বয় দরকার। এখন আন্তর্জাতিক তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় আবার বাড়ায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপও বেড়েছে। ফলে সরকার যদি একদিকে ভর্তুকি ধরে রাখে, অন্যদিকে রাজস্ব না বাড়ে, তবে বাজেটের ভেতরের চাপ দ্রুত তীব্র হবে—আইএমএফের অবস্থানকে এভাবেই পড়া যায়।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—চলমান কর্মসূচি টেনে নেওয়া হবে, নাকি নতুন শর্তে নতুন দরকষাকষি শুরু হবে? আইএমএফের মার্চ ২০২৬-এ ঢাকা সফরের পর দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশকে “ambitious policies and structural reforms” বা উচ্চাভিলাষী নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে যেতে হবে, এবং এপ্রিলের স্প্রিং মিটিংসে ‘best path forward’ খোঁজা হবে। অর্থাৎ দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; কিন্তু আইএমএফ স্পষ্ট করেছে, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী নতুন সরকারের জন্য এটাই কঠিন সংস্কারের উপযুক্ত সময়।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি দুটি। প্রথমত, অর্থ না এলে জ্বালানি আমদানি, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, বাজেট সহায়তা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থায় চাপ পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকার যদি সব শর্ত দ্রুত মানতে চায়, তাহলে কর বৃদ্ধি, ভর্তুকি সমন্বয়, ব্যাংক সংস্কার এবং বিনিময় হার বাস্তবায়নের সামাজিক ও রাজনৈতিক খরচও বাড়বে। তাই এটি কেবল অর্থ ছাড়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরের পুরোনো দুর্বলতার সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত।

সব মিলিয়ে ছবিটা হলো, আইএমএফ এখন বাংলাদেশকে সময় দিচ্ছে—কিন্তু ছাড় দিচ্ছে না। তারা বলছে, রাজস্ব বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং খাতের বাস্তব অবস্থা সামনে আনতে হবে, বিনিময় হার সংস্কারকে কাগজ থেকে বাজারে নামাতে হবে, আর ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করতে হবে। বাংলাদেশের সরকার যদি এই বার্তাকে কেবল ঋণকিস্তি জটিলতা হিসেবে দেখে, তাহলে সামনে আরও বড় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি এটিকে অর্থনীতির গভীর সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নেয়, তাহলে বর্তমান সংকটই নতুন সমঝোতার ভিত্তি হতে পারে।