১১:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
হরমুজ খোলা বলছে ইরান, অবরোধ বহাল বলছে ট্রাম্প অপারেটরহীন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং: বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকা ৮,২২২ কোটি টাকার জ্বালানি স্বপ্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বরিশালে আওয়ামী লীগের হঠাৎ মিছিল, মুখ ঢেকে স্লোগান আইএমএফের কিস্তি আটকে কেন, বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ রাশেদ প্রধানের বাসভবনে হামলা নিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ রাষ্ট্রের স্বার্থেই সচেতন মানুষকে ১৭ এপ্রিল স্মরণ করতে হবে নাটোরে পুকুরে গোসল করতে নেমে দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া হাম আতঙ্কে দেশ: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২১১ মানিকগঞ্জে নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার ঘিরে গণপিটুনি, দুই ভাই নিহত ঝিনাইদহে চায়ের বাকি টাকা নিয়ে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১০

অপারেটরহীন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং: বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকা ৮,২২২ কোটি টাকার জ্বালানি স্বপ্ন

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থাকে দ্রুততর করার জন্য যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পকে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই এখন উল্টো প্রশ্নের মুখে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি উপকূলের কাছে নির্মিত এই অবকাঠামো প্রকল্প কমিশনিংয়ের পরও দীর্ঘ সময় পুরো সক্ষমতায় চালু করা যায়নি। মূল জট তৈরি হয়েছে অপারেটর নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের বারবার পরিবর্তনকে ঘিরে।   অপারেটর না থাকায় প্রকল্পটি প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারছে না।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প

সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম হলো সমুদ্রে ভাসমান একটি বিশেষ জেটি-ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অফশোর ও অনশোর পাইপলাইন যুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে বড় সমুদ্রগামী তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি স্থলভাগের সংরক্ষণাগারে জ্বালানি খালাস করা সম্ভব হয়। এতে লাইটার জাহাজের প্রয়োজন কমে, সময় বাঁচে, খরচ কমে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা। পাঠানো লেখার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ; এটি মাতারবাড়ির কাছে সমুদ্র থেকে মহেশখালী হয়ে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য তৈরি।

সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যেও এই প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট। সরকারি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা চাওয়া হয়েছে, এবং কাজের পরিধিতে অফশোর ও অনশোর—উভয় অংশের সব সহায়ক অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত আছে। অন্যদিকে সরকারি সংবাদ সংস্থা আগেই জানিয়েছিল, এসপিএম চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। পরে সরকারি খবরে আরও বলা হয়, এই অবকাঠামো বছরে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং

অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অপারেটর নিয়োগ

প্রকল্পটি চালুর পর প্রথমে নির্মাণকারী চীনা প্রতিষ্ঠানকেই অপারেটর করার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেই পথ থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হয়। কিন্তু একাধিক দফার দরপত্রের পরও চূড়ান্তভাবে অপারেটর ঠিক করা যায়নি। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়া, শর্ত নিয়ে আপত্তি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে অনুমোদন জট—সব মিলিয়ে প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে।

সরকারি ক্রয় সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ২০২৫ সালের শেষ দিকে আবারও এসপিএমের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করে। সেখানে সাত বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা, অন্তত ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সমমানের প্রকল্পে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, ন্যূনতম ৩৫ মিলিয়ন ডলারের গড় বার্ষিক টার্নওভার এবং ১৪ মিলিয়ন ডলারের তরল সম্পদের মতো কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। এই শর্তগুলো প্রকল্পের প্রযুক্তিগত গুরুত্ব বোঝালেও, একই সঙ্গে এটি কেন সীমিতসংখ্যক বিডারের মধ্যে আটকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

ব্যয় বেড়েছে, সময়ও গেছে বহু দূর

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় প্রশ্ন ব্যয় বৃদ্ধি। পাঠানো লেখার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রায় ৪,৯৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় পরে বেড়ে ৮,২২২ কোটিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ খরচ বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। নির্ধারিত সময়সীমাও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে; তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে লেগেছে প্রায় নয় বছর।

এ প্রকল্প ব্যয় ধাপে ধাপে বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৃতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় ৭,১২৪.৬২ কোটি টাকায় উঠেছে। পরে ২০২৩ সালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্প ব্যয় ৮,৩৪১ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়। আর ২০২৬ সালের পাঠানো লেখায় ব্যয় ৮,২২২ কোটি টাকা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের আর্থিক চিত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু একথা স্পষ্ট যে প্রাথমিক হিসাব থেকে ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং

অর্থনীতির জন্য ক্ষতি কোথায়

এসপিএম চালু না থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতায়। গভীর সমুদ্র থেকে বড় জাহাজের তেল খালাসে দীর্ঘ সময় লাগে, লাইটার জাহাজ ব্যবহার করতে হয়, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হয়। পাঠানো লেখায় বলা হয়েছে, এসপিএম পুরোপুরি চালু হলে খালাসের সময় ১১ দিন থেকে কমে ৪৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব এবং অতিরিক্ত দুই লাখ টন মজুত সক্ষমতা তৈরি হবে, যা প্রায় ১০ দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সহায়ক।

এই দেরির ফলে শুধু সম্ভাব্য সাশ্রয় হারাচ্ছে দেশ, তা নয়—ঋণ পরিশোধও শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্প থেকে পূর্ণ আর্থিক রিটার্ন না এসেই তার আর্থিক বোঝা বইতে হচ্ছে। ব্যবসায়িক ভাষায় এটিকে বলা যায় “নিষ্ক্রিয় সম্পদের আর্থিক চাপ”। যে অবকাঠামো দেশের জ্বালানি আমদানি খরচ কমাতে পারত, সেটিই এখন উল্টো ব্যয়বহুল স্থবিরতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

দরপত্র প্রক্রিয়া ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক জট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। পাঠানো লেখায় উল্লেখ আছে, প্রথম দফার টেন্ডার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় বাতিল হয়। পরে সংশোধিত টেন্ডারেও ১১টি প্রতিষ্ঠান নথি কিনলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি বিড। আরও আগে এক দফায় আগ্রহ দেখিয়েছিল এক ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু চূড়ান্ত প্রস্তাব আসে মাত্র দুটি। এই ধরনের চিত্র সাধারণত বোঝায় যে শর্ত, ঝুঁকি, মূল্যায়ন কাঠামো বা নীতিগত অনিশ্চয়তা বাজারকে নিরুৎসাহিত করছে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন হলো, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার পরও কেন অপারেশন-পর্বের প্রস্তুতি আগে থেকে নিশ্চিত করা গেল না। এত বড় বিনিয়োগের প্রকল্পে কমিশনিংয়ের আগেই অপারেশন কাঠামো, জনবল, নিরাপত্তা প্রটোকল, রক্ষণাবেক্ষণ মডেল এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকার কথা। যদি তা না থাকে, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকে কেবল নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হিসেবে দেখা হয়েছে—যা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা।

সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)

এখন কী করা জরুরি

প্রথম কাজ হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়নের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত, দরপত্রের যোগ্যতা শর্ত বাস্তবসম্মত কি না তা পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতা বাড়ে কিন্তু নিরাপত্তা ও দক্ষতার প্রশ্নে ছাড় না দিতে হয়। তৃতীয়ত, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। পাঠানো লেখায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিমও দ্রুত প্রকল্প চালুর প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্বের কারণ তদন্তের কথা বলেছেন।

সব মিলিয়ে, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি প্রয়োজনীয় ও সম্ভাবনাময় অবকাঠামো। কিন্তু অপারেটরহীনতা, দরপত্র বিতর্ক এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এটি এখন উন্নয়ন-দর্শনের এক অস্বস্তিকর উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটি যত দিন পুরোপুরি চালু না হবে, তত দিন বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকবে শুধু একটি জেটি নয়—পড়ে থাকবে সাশ্রয়ের সুযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি বড় পরীক্ষা।

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ খোলা বলছে ইরান, অবরোধ বহাল বলছে ট্রাম্প

অপারেটরহীন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং: বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকা ৮,২২২ কোটি টাকার জ্বালানি স্বপ্ন

০৯:২৬:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থাকে দ্রুততর করার জন্য যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পকে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই এখন উল্টো প্রশ্নের মুখে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি উপকূলের কাছে নির্মিত এই অবকাঠামো প্রকল্প কমিশনিংয়ের পরও দীর্ঘ সময় পুরো সক্ষমতায় চালু করা যায়নি। মূল জট তৈরি হয়েছে অপারেটর নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের বারবার পরিবর্তনকে ঘিরে।   অপারেটর না থাকায় প্রকল্পটি প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারছে না।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প

সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম হলো সমুদ্রে ভাসমান একটি বিশেষ জেটি-ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অফশোর ও অনশোর পাইপলাইন যুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে বড় সমুদ্রগামী তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি স্থলভাগের সংরক্ষণাগারে জ্বালানি খালাস করা সম্ভব হয়। এতে লাইটার জাহাজের প্রয়োজন কমে, সময় বাঁচে, খরচ কমে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা। পাঠানো লেখার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ; এটি মাতারবাড়ির কাছে সমুদ্র থেকে মহেশখালী হয়ে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য তৈরি।

সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যেও এই প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট। সরকারি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা চাওয়া হয়েছে, এবং কাজের পরিধিতে অফশোর ও অনশোর—উভয় অংশের সব সহায়ক অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত আছে। অন্যদিকে সরকারি সংবাদ সংস্থা আগেই জানিয়েছিল, এসপিএম চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। পরে সরকারি খবরে আরও বলা হয়, এই অবকাঠামো বছরে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং

অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অপারেটর নিয়োগ

প্রকল্পটি চালুর পর প্রথমে নির্মাণকারী চীনা প্রতিষ্ঠানকেই অপারেটর করার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেই পথ থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হয়। কিন্তু একাধিক দফার দরপত্রের পরও চূড়ান্তভাবে অপারেটর ঠিক করা যায়নি। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়া, শর্ত নিয়ে আপত্তি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে অনুমোদন জট—সব মিলিয়ে প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে।

সরকারি ক্রয় সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ২০২৫ সালের শেষ দিকে আবারও এসপিএমের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করে। সেখানে সাত বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা, অন্তত ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সমমানের প্রকল্পে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, ন্যূনতম ৩৫ মিলিয়ন ডলারের গড় বার্ষিক টার্নওভার এবং ১৪ মিলিয়ন ডলারের তরল সম্পদের মতো কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। এই শর্তগুলো প্রকল্পের প্রযুক্তিগত গুরুত্ব বোঝালেও, একই সঙ্গে এটি কেন সীমিতসংখ্যক বিডারের মধ্যে আটকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

ব্যয় বেড়েছে, সময়ও গেছে বহু দূর

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় প্রশ্ন ব্যয় বৃদ্ধি। পাঠানো লেখার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রায় ৪,৯৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় পরে বেড়ে ৮,২২২ কোটিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ খরচ বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। নির্ধারিত সময়সীমাও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে; তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে লেগেছে প্রায় নয় বছর।

এ প্রকল্প ব্যয় ধাপে ধাপে বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৃতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় ৭,১২৪.৬২ কোটি টাকায় উঠেছে। পরে ২০২৩ সালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্প ব্যয় ৮,৩৪১ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়। আর ২০২৬ সালের পাঠানো লেখায় ব্যয় ৮,২২২ কোটি টাকা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের আর্থিক চিত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু একথা স্পষ্ট যে প্রাথমিক হিসাব থেকে ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং

অর্থনীতির জন্য ক্ষতি কোথায়

এসপিএম চালু না থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতায়। গভীর সমুদ্র থেকে বড় জাহাজের তেল খালাসে দীর্ঘ সময় লাগে, লাইটার জাহাজ ব্যবহার করতে হয়, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হয়। পাঠানো লেখায় বলা হয়েছে, এসপিএম পুরোপুরি চালু হলে খালাসের সময় ১১ দিন থেকে কমে ৪৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব এবং অতিরিক্ত দুই লাখ টন মজুত সক্ষমতা তৈরি হবে, যা প্রায় ১০ দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সহায়ক।

এই দেরির ফলে শুধু সম্ভাব্য সাশ্রয় হারাচ্ছে দেশ, তা নয়—ঋণ পরিশোধও শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্প থেকে পূর্ণ আর্থিক রিটার্ন না এসেই তার আর্থিক বোঝা বইতে হচ্ছে। ব্যবসায়িক ভাষায় এটিকে বলা যায় “নিষ্ক্রিয় সম্পদের আর্থিক চাপ”। যে অবকাঠামো দেশের জ্বালানি আমদানি খরচ কমাতে পারত, সেটিই এখন উল্টো ব্যয়বহুল স্থবিরতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

দরপত্র প্রক্রিয়া ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক জট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। পাঠানো লেখায় উল্লেখ আছে, প্রথম দফার টেন্ডার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় বাতিল হয়। পরে সংশোধিত টেন্ডারেও ১১টি প্রতিষ্ঠান নথি কিনলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি বিড। আরও আগে এক দফায় আগ্রহ দেখিয়েছিল এক ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান, কিন্তু চূড়ান্ত প্রস্তাব আসে মাত্র দুটি। এই ধরনের চিত্র সাধারণত বোঝায় যে শর্ত, ঝুঁকি, মূল্যায়ন কাঠামো বা নীতিগত অনিশ্চয়তা বাজারকে নিরুৎসাহিত করছে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন হলো, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার পরও কেন অপারেশন-পর্বের প্রস্তুতি আগে থেকে নিশ্চিত করা গেল না। এত বড় বিনিয়োগের প্রকল্পে কমিশনিংয়ের আগেই অপারেশন কাঠামো, জনবল, নিরাপত্তা প্রটোকল, রক্ষণাবেক্ষণ মডেল এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকার কথা। যদি তা না থাকে, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকে কেবল নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হিসেবে দেখা হয়েছে—যা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা।

সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)

এখন কী করা জরুরি

প্রথম কাজ হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়নের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত, দরপত্রের যোগ্যতা শর্ত বাস্তবসম্মত কি না তা পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতা বাড়ে কিন্তু নিরাপত্তা ও দক্ষতার প্রশ্নে ছাড় না দিতে হয়। তৃতীয়ত, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। পাঠানো লেখায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিমও দ্রুত প্রকল্প চালুর প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্বের কারণ তদন্তের কথা বলেছেন।

সব মিলিয়ে, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি প্রয়োজনীয় ও সম্ভাবনাময় অবকাঠামো। কিন্তু অপারেটরহীনতা, দরপত্র বিতর্ক এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এটি এখন উন্নয়ন-দর্শনের এক অস্বস্তিকর উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটি যত দিন পুরোপুরি চালু না হবে, তত দিন বঙ্গোপসাগরে পড়ে থাকবে শুধু একটি জেটি নয়—পড়ে থাকবে সাশ্রয়ের সুযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি বড় পরীক্ষা।