বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয়বারের মতো কোচ হিসেবে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইরাকের প্রধান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব ছাড়ার পর ইরাকের কোচ হওয়ার সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দল সামলানো, বিশ্বকাপে ওঠার গুরুত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিজ্ঞ কোচ।
ইরাকের ফুটবলের প্রতি দীর্ঘদিনের আগ্রহ থেকেই দেশটির জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন গ্রাহাম আর্নল্ড। ২০০৭ সালের এশিয়ান কাপে ইরাকের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের স্মৃতি এখনও তার মনে গেঁথে আছে। সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ইরাককে দেখে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, দলটি ভবিষ্যতে নিয়মিত বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে। কিন্তু তা না হওয়ায় বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন ইরাককে আবার বিশ্বকাপে নেওয়ার সুযোগ পান, তখন সেই চ্যালেঞ্জ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি। তার মতে, অস্ট্রেলিয়া দলকে তিনি যতদূর নেওয়া সম্ভব ছিল, নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর নতুন একটি কঠিন মিশনই তার ফুটবল জীবনে নতুন অনুপ্রেরণা এনে দেয়।
বাগদাদে কাটানো সময়

দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধু ম্যাচের সময় ইরাকে যাওয়া-আসা করেননি আর্নল্ড। তিনি প্রায় আট মাস বাগদাদে অবস্থান করেছেন। স্থানীয় লিগ, অবকাঠামো এবং খেলোয়াড়দের মান কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি দেশের মানুষের মানসিকতা বোঝার চেষ্টাও করেছেন।
তার বিশ্বাস, একটি জাতীয় দলকে সফল করতে হলে শুধু মাঠের বিষয় নয়, দেশের সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগও বুঝতে হয়। সেই লক্ষ্যেই তিনি সরাসরি ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং দেশের ফুটবল পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন।
যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্বকাপের লড়াই
বিশ্বকাপে ওঠার পথে বলিভিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্লে-অফ ম্যাচের আগে বড় ধরনের সংকটে পড়ে ইরাক দল। আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দলকে দীর্ঘ ও কঠিন ভ্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।
আর্নল্ড জানান, পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছিল। তবে তা সম্ভব না হওয়ায় খেলোয়াড়দের নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়। দীর্ঘ সড়ক ও বিমানযাত্রার মধ্যেও দলের মনোবল ধরে রাখাই ছিল তার প্রধান কাজ।
বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে শক্ত রাখার জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেন। তার লক্ষ্য ছিল খেলোয়াড়দের পুরো মনোযোগ ম্যাচের দিকে রাখা।

বিশ্বকাপে ওঠার গুরুত্ব
আর্নল্ডের মতে, ইরাকে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি জাতীয় আবেগের অংশ। জাতীয় দলের ম্যাচ চলার সময় পুরো দেশ যেন থমকে যায়।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে নানা সংকটের মধ্যে থাকা দেশের জন্য বিশ্বকাপ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি শুধু ক্রীড়া সাফল্য নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে দেশের নতুন পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ।
তার অভিজ্ঞতায়, বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের পর একটি দেশের ফুটবল কাঠামোতে নতুন বিনিয়োগ আসে, তরুণদের আগ্রহ বাড়ে এবং উন্নয়নের পথ আরও বিস্তৃত হয়।
এক দলে দুই ধারার ফুটবলার
ইরাক দলে স্থানীয় লিগের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বিদেশে বেড়ে ওঠা প্রবাসী ফুটবলারও রয়েছেন। শুরুতে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কিছুটা দূরত্ব ছিল বলে জানান আর্নল্ড।
তিনি দলীয় পরিবেশে পরিবর্তন এনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করেন। তার মতে, স্থানীয় ফুটবলাররা দেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত, আর প্রবাসী খেলোয়াড়রা নিজেদের পরিবার ও শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে অতিরিক্ত প্রেরণা পায়।
এই দুই শক্তির সমন্বয়ই ইরাক দলকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা
৬২ বছর বয়সী আর্নল্ড এখনও নিজেকে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত মনে করেন। তিনি জানান, আরও কয়েকটি দেশকে বিশ্বকাপে তোলার স্বপ্ন তার রয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।
তার ভাষায়, তিনি এখনও সুস্থ, উদ্যমী এবং নতুন সাফল্যের ক্ষুধায় অনুপ্রাণিত। তাই ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাই খোলা রাখছেন এই অভিজ্ঞ কোচ।
ইরাককে বিশ্বকাপে ফেরানোই এখন তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য পূরণ হলে দেশটির ফুটবলে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে বলেই বিশ্বাস গ্রাহাম আর্নল্ডের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















