দার্জিলিং পাহাড়ে একসময় দেয়ালজুড়ে দেখা যেত আলাদা গোরখাল্যান্ড রাজ্যের দাবির পোস্টার। কিন্তু এখন সেই দাবির দৃশ্যমানতা অনেকটাই ম্লান। ২০১৭ সালের সহিংস আন্দোলনের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে, যখন প্রায় ১০০ দিন এই অঞ্চল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং প্রাণহানি ঘটেছিল প্রায় এক ডজন মানুষের। সেই একমুখী গোরখাল্যান্ড দাবিকে ঘিরে রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির এজেন্ডায় পরিবর্তন
গত কয়েক বছরে দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। গোরখাল্যান্ডের একক ইস্যু থেকে সরে এসে এখন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় সামনে আসছে। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকার মতো দার্জিলিংয়েও রাম নবমী উপলক্ষে বড় শোভাযাত্রা হয়। শত শত মানুষ ধর্মীয় পতাকা হাতে নিয়ে শহরের কেন্দ্র দিয়ে মিছিল করেন, যা পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তৃণমূল সমর্থিত শক্তির উত্থান
এই শোভাযাত্রার আয়োজন করেন দার্জিলিং বিধানসভা আসনের প্রার্থী বিজয় কুমার রায়, যিনি তৃণমূল সমর্থিত ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার সঙ্গে যুক্ত। একই দিনে ঘুম এলাকা থেকেও দলের সভাপতি অনীত থাপা মিছিলের নেতৃত্ব দেন। অনীত থাপা বর্তমানে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পরিচালনা করছেন এবং তাঁর মতে, এই ধরনের কার্যক্রম প্রমাণ করে পাহাড়ের মানুষ “সঠিক পথে এগোচ্ছে” এবং এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে।
বিজেপি-জেজেএম জোটের অবস্থান
অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দানে রয়েছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ও বিজেপির জোট। এই জোটের প্রার্থী নোমান রায় মূলত ছোট পরিসরে দলীয় বৈঠক করছেন। যদিও নির্বাচনে বিজেপির প্রতীক ব্যবহার করা হচ্ছে, তবুও তাঁদের মূল লক্ষ্য গোরখাল্যান্ড রাজ্যের দাবি। নোমান রায় বলেন, এই দাবি পূরণে বিজেপি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে—এই আশাতেই তারা নির্বাচনে লড়ছেন।
ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ও কেন্দ্রের ভূমিকা
দার্জিলিং পাহাড়ের মানুষের আশা এখন কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে হওয়া ত্রিপাক্ষিক আলোচনার দিকে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কেন্দ্র সরকার পঙ্কজ কুমার সিংহকে দার্জিলিং, ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলের বিষয়ে আলোচনার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এর বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিমল গুরুংয়ের চ্যালেঞ্জ
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার অন্যতম প্রধান নেতা বিমল গুরুং, যিনি দীর্ঘদিন ধরে গোরখাল্যান্ড আন্দোলনের মুখ, তিনি এবার তাঁর দলের প্রার্থীদের পক্ষে জোর প্রচার চালাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ নেতা নোমান রায়ের জয়ের বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী। এমনকি তিনি ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রার্থী পরাজিত হলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর প্রভাব কিছুটা কমেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
নতুন শক্তির আবির্ভাব
এই নির্বাচনে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তিও আত্মপ্রকাশ করেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তা অজয় এডওয়ার্ডস গড়ে তুলেছেন ভারতীয় গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। পাশাপাশি বাম দল ও কংগ্রেসও নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রয়েছে, ফলে দার্জিলিং পাহাড়ে এবার লড়াই একাধিক পক্ষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতি এখন আর একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। শান্তি, উন্নয়ন, পরিচয় রাজনীতি এবং নতুন নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন এক জটিল ও বহুস্তরীয় লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















