ওয়াশিংটন থেকে ব্রাসেলস এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের মধ্যে “থুসিডিডিস ফাঁদ” নিয়ে এক ধরনের গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্রাহাম অ্যালিসনের ‘ডেস্টিনড ফর ওয়ার’ বই থেকে এই ধারণার উৎপত্তি। সেখানে বলা হয়, যখনই কোনো উদীয়মান শক্তি বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এই ধারণা যেমন সুবিধাজনক, তেমনি তা এক ধরনের সরলীকৃত ও অলস ব্যাখ্যা।
এই তত্ত্ব ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। অধিকাংশ যুদ্ধই হয়েছে দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পদের জন্য। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাও এক ধরনের দখলযুদ্ধের ফল। তাই মানব ইতিহাসকে শুধুমাত্র অনিবার্য সংঘাতের ধারায় সীমাবদ্ধ করা আসলে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃষ্টিভঙ্গি।
গ্রাহাম অ্যালিসন, যিনি বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিরক্ষা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, নিজেও বলেছেন যে এই “ফাঁদ” এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু ওয়াশিংটন এই সতর্কতাকে গুরুত্ব দেয়নি; বরং এটিকে সংঘাতের অনুমোদন হিসেবে গ্রহণ করেছে।

‘ডেস্টিনড ফর ওয়ার’ বইটি ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক বয়ান। এতে পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং সংঘাতকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে মানুষ ধীরে ধীরে এই ধারণা মেনে নেয় যে সংঘাত অনিবার্য, ফলে বর্তমান উত্তেজনার প্রকৃত কারণগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।
কেন ২১শ শতককে বোঝার জন্য ২,৫০০ বছরের পুরোনো গ্রিক নগররাষ্ট্রের যুদ্ধকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে? কেন এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে? এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পশ্চিমাকেন্দ্রিক নয়, বরং বিভ্রান্তিকরও।
সংঘাতকে যদি একটি অবশ্যম্ভাবী নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সামরিক ঘেরাও, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনকে সহজেই “প্রতিক্রিয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এতে যুদ্ধ যেন ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক ফলাফল—এমন ধারণা তৈরি হয় এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যগুলো আড়াল হয়ে যায়।

এই ধারণার ফলে জবাবদিহিতা কমে যায়। যদি সংঘাত একটি “ফাঁদ” হয়, তাহলে উত্তেজনা বাড়লে কেউ দায়ী থাকে না। জোট সম্প্রসারণ, সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপগুলো তখন “ইতিহাসের নিয়ম” হিসেবে তুলে ধরা হয়।
পশ্চিমা ইতিহাস, বিশেষ করে ইউরোপের ইতিহাস, বারবার সম্প্রসারণ ও উপনিবেশ স্থাপনের যুদ্ধ দিয়ে চিহ্নিত। কিন্তু অন্যান্য সভ্যতা ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে। চীন, ভারত, ইরানসহ অনেক দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
ইরান আধুনিক যুগে কোনো ভূখণ্ড দখলের যুদ্ধ শুরু করেনি। চীনও চার দশকের বেশি সময় ধরে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়ায়নি। তবুও প্রাচীন গ্রিসের যুদ্ধকে ভবিষ্যতের নির্দেশিকা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে—যা একটি সংকীর্ণ ব্যাখ্যা।
“থুসিডিডিস ফাঁদ” আসলে সামরিক-শিল্প জোটের জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার। জনগণকে বোঝানো হয় যে একটি উদীয়মান শক্তি অস্তিত্বের জন্য হুমকি, ফলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভিয়েতনাম থেকে ইরাক ও আফগানিস্তান—“নিরাপত্তা” ও “গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার নামে পশ্চিমা শক্তির হস্তক্ষেপ বহু দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের মূল কারণ শুধু চীনের সামরিক শক্তি নয়, বরং তার উন্নয়ন মডেল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে চীন কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে, তাও পশ্চিমা কাঠামো ছাড়াই। এই সাফল্য পশ্চিমা আধিপত্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তন পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর জন্য অস্বস্তিকর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে বলা হচ্ছে—একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। কিন্তু এসব দেশের অনেকেরই চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা অন্যের দ্বন্দ্বে জড়াতে চায় না।
বাস্তব প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের কোন পথ বেছে নেওয়া হবে। একদিকে রয়েছে বহির্ভরশীল ও সম্পদনির্ভর মডেল, অন্যদিকে রয়েছে আত্মনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ার পথ।
অনেক দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে অর্থনীতি গড়ে তোলা। এটি কোনো বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের বাস্তববাদী পথ।
“থুসিডিডিস ফাঁদ” ততটাই শক্তিশালী, যতটা আমরা এটিকে সত্য বলে মেনে নিই। যদি নীতিনির্ধারকেরা বিশ্বাস করেন যে সংঘাত অনিবার্য, তাহলে তারা কূটনীতি ও সহযোগিতাকে অবহেলা করবেন এবং সমঝোতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখবেন।
বিশ্ব এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি দেশের একচেটিয়া আধিপত্যের যুগ শেষের পথে। একটি বহুমেরু বিশ্ব হয়তো ঝুঁকিমুক্ত হবে না, কিন্তু এটি আরও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে—যদি আমরা ভ্রান্ত বয়ান থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে বুঝতে পারি।
লেখকঃ চন্দ্রন নাইর গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর টুমরোর প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্লাব অব রোমের সদস্য। তিনি ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং চায়না: গভর্ন্যান্স, সমাজ-অর্থনীতি, বৈশ্বিক প্রভাব’, ‘ডিসম্যান্টলিং গ্লোবাল হোয়াইট প্রিভিলেজ: পোস্ট-পশ্চিমা বিশ্বে ন্যায়সংগততা’ এবং ‘দ্য সাসটেইনেবল স্টেট: সরকার, অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ’ বইগুলোর লেখক।
চন্দ্রন নাইর 


















