একসময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। ১৮৫৯ সালে জেমস উইলসন এখানে এসে প্রথম বাজেট প্রণয়ন করেন, চালু করেন আয়কর ব্যবস্থা। সেই সময়ের আর্থিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সময়ের সঙ্গে শহরটি রাজধানীর মর্যাদা হারিয়েছে, ভৌগোলিক পরিসর কমেছে, এমনকি নামও বদলেছে। কিন্তু আজকের কলকাতা এক নতুন পরিচয়ে দাঁড়িয়ে—ভারতের অন্যতম ‘বাসযোগ্য’ মহানগর হিসেবে।
তবে এই স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক বাস্তবতা—অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও সম্ভাবনার অপচয়।
স্বস্তির শহর, কম খরচের জীবন
কলকাতায় বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি একটি সুবিধাজনক শহর হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সংগীতের সমৃদ্ধ পরিবেশ শহরটিকে একটি আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থাও তুলনামূলক সস্তা ও সহজলভ্য। নতুন ফ্লাইওভার, রাস্তা এবং শহরের সম্প্রসারণ এটিকে আরও সংযুক্ত করেছে। নতুন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, হোটেল ও আধুনিক আবাসন শহরের চেহারায় পরিবর্তন এনেছে।

উন্নয়নের পেছনে রাজনৈতিক ভূমিকা
২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহরের উন্নয়নে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছেন। দীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসনের পর শ্রম অসন্তোষ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব কাটিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে।
সরকারি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা কলকাতাকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জন্য তুলনামূলকভাবে বাসযোগ্য করে তুলেছে।
কিন্তু অর্থনীতির গতি কোথায়?
এই স্বস্তির মধ্যেই বড় প্রশ্ন উঠছে—শহরের অর্থনীতি কি এগোচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান কমছে। উচ্চমানের চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে মেধাবী তরুণরা অন্য শহরে চলে যাচ্ছে।
দেশের অন্য রাজ্যগুলো যেখানে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সেই দৌড়ে পিছিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বড় অংশের বিদেশি বিনিয়োগ গেছে মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছে খুবই সামান্য অংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ভর্তুকি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়—আয়ের উৎসও বাড়াতে হবে।
ঐতিহ্যভিত্তিক টিকে থাকা
কলকাতা এখনও পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো দরিদ্র রাজ্য থেকে আসা মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করে।
মহামারির পর ‘বাড়ি থেকে কাজ’ সংস্কৃতির কারণে কিছু পেশাজীবী শহরে ফিরে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে শহরটি তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
নির্বাচনের আগে কঠিন সমীকরণ

আসন্ন নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন। তবে ভোটার তালিকা সংশোধনে প্রায় ১২ শতাংশ নাম বাদ পড়ায় পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
একদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে সামাজিক সহনশীলতার প্রশ্ন—ভোটারদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত। বর্তমান নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নাকি নতুন দিক—এই দ্বন্দ্বেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ।
স্বস্তি না স্থবিরতা?
কলকাতার বর্তমান অবস্থা এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে এটি সাশ্রয়ী, শান্ত ও সংস্কৃতিমনস্ক শহর; অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া, সুযোগহীনতার চিত্রও স্পষ্ট।
অন্যান্য বড় শহর দ্রুত উন্নয়নের চাপে ভুগলেও কলকাতার এই ‘স্বস্তি’ আসলে উন্নয়নের অভাবের লক্ষণ—এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















