ইরান যুদ্ধ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে অনেক দেশ আবার ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। অস্ট্রেলিয়া নাগরিকদের গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানাচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া কম সময়ে গোসল করার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি যেন ভিন্ন এক ‘৭০-এর দশকের স্মৃতিচারণে’ ব্যস্ত—তিনি সময় কাটাচ্ছেন বিখ্যাত রক ব্যান্ড ডিপ পার্পলের সঙ্গে।
ধাতব সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত তাকাইচি তাঁর প্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করার মতো সময় বের করতে পারছেন। অথচ জাপান প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে দরিদ্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবুও টোকিওর পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত।
যদিও সাধারণ মানুষ যুদ্ধের বিরোধিতা করছে, তাকাইচির জনপ্রিয়তা স্থিতিশীল রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে তাঁর সমর্থন বেড়ে ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। অধিকাংশ মানুষ তাঁর কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে।
তবে এর পুরো কৃতিত্ব তিনি একা নিতে পারেন না। জাপানের জ্বালানি বৈচিত্র্য নীতি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে, যার লক্ষ্য কোনো একটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানো।
সাম্প্রতিক সময়ে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে চীনের অর্থনৈতিক চাপ—সবকিছুই জাপানের জন্য এই নীতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে জাপানকে প্রায়ই ‘জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর’ বলে সমালোচনা করা হয়। কিন্তু কয়লা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ না করা এবং পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শোধনাগার চালু রাখার সিদ্ধান্ত এখন সেই সমালোচনার মূল্য আদায় করে দিচ্ছে।
এদিকে তাকাইচি দ্রুত গ্যাসে ভর্তুকি চালু করেছেন, যার ফলে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের কাছাকাছি দামে জ্বালানি রাখা সম্ভব হয়েছে। সরবরাহ সংকট কমাতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। রাজনৈতিক দিক থেকেও তিনি কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন।

ওয়াশিংটন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাঁর প্রশংসা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হলেও দেশের ভেতরে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। জাপানের জনগণ বুঝতে পেরেছে, এটি কৌশলের অংশ। অতীতে জাপানকে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই এমন কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলা এবং একই সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়ার মুখে না পড়া। এখন পর্যন্ত এই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে তাকাইচি নিজের পক্ষে কাজে লাগাতেও পারেন। বর্তমান সংকট জাপানের পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে নতুন যুক্তি তৈরি করেছে। তিনি ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধনের প্রচেষ্টা এখন জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
একইভাবে, ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টিও আবার সামনে এসেছে। আগে ফ্রান্স এ ধরনের উদ্যোগে আপত্তি জানালেও এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। চলতি মাসে জোটটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিদল টোকিওতে পাঠিয়েছে।
জাপানের প্রায় ৯৪ শতাংশ তেল আমদানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। এত বড় নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আতঙ্ক না ছড়ানোর কারণ হলো অতীতের তেল সংকট থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা। দেশটি বড় আকারের মজুত তৈরি করেছে, যা আগামী বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, এবং তা দেখা দিচ্ছে অপ্রত্যাশিত জায়গায়—বাথরুমে ব্যবহৃত সামগ্রীতে। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করেছে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হাঁটায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এতে আবাসন খাতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো কেবল শুরু। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার গোল্ডেন উইক ছুটির পর নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানাতে পারে। এটি অনেকটা কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর সময়ের মতো, যখন বিদেশে বড় পরিবর্তন হলেও জাপানে শুরুতে তার প্রভাব কম ছিল।
জাপানের বিদ্যুৎ উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম এবং দেশটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু বড় ঝুঁকি হলো দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব, যা আগাম অনুমান করা কঠিন।
![]()
মহামারি আমাদের দেখিয়েছে, সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা জটিল। ইতোমধ্যে কিছু খাদ্যপণ্য বাজার থেকে সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো চিকিৎসা সরঞ্জামের সম্ভাব্য ঘাটতি, যেমন অস্ত্রোপচারের গ্লাভস।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং মজুরি বৃদ্ধির ওপর প্রভাব পড়বে—যে সময়ে বাস্তব মজুরি মাত্রই বাড়তে শুরু করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে তাকাইচির ধারাবাহিক যোগাযোগ দেখায়, তিনি পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই উত্তেজনা কমাতে চাইছেন। টোকিওর তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাপানি জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এই পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ধৈর্যও সীমাহীন নয়। ওয়াশিংটনে তাকাইচির সফরের সময় তিনি সন্তুষ্ট থাকলেও সম্প্রতি জাপানের সীমিত সমর্থনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সম্পর্ক বজায় রাখতে তাকাইচিকে হয়তো আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে—যেমন লজিস্টিক সহায়তা বা জাপানের উন্নত মাইন অপসারণকারী জাহাজ ব্যবহার।
তবে দেশের ভেতরে এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ বাড়ছে, যদিও তা এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে।
সবশেষে, তাকাইচির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সংকট যাতে বাথরুমের সীমা ছাড়িয়ে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
গিয়ারয়েড রেইডি 



















