পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের মাত্র দুই দিন আগে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একাধিক কেন্দ্রে সংঘর্ষ, বোমা উদ্ধারের ঘটনা এবং গুলিবর্ষণের অভিযোগ সামনে আসায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংঘর্ষে উত্তপ্ত একাধিক এলাকা
সোমবার ভাঙড়ে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের একটি সমাবেশ ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকদের প্রতিবাদ থেকে সংঘর্ষের সূচনা হয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া প্রার্থীর উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে স্লোগান-পাল্টা স্লোগান পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ভাঙড় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত।
একই দিনে নন্দীগ্রামেও তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে। উত্তেজনা বাড়লে কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
কোচবিহারের নাতাবাড়ি এলাকায় এক বিজেপি কর্মীর বাড়ির বাইরে থেকে একটি কাঁচা বোমা উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে সুন্দরবনের গোসাবায় এক তৃণমূল কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, যাতে তিনি আহত হন। এসব ঘটনায় ভোটের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
‘টার্গেটেড’ গ্রেফতার অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের আগে তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, একটি তালিকা ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা পক্ষপাতদুষ্ট এবং শুধুমাত্র তৃণমূল কর্মীদের লক্ষ্য করে তৈরি।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে ৮০০-র বেশি তৃণমূল কর্মীকে বিনা কারণে গ্রেফতার করা হতে পারে। আদালত বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটের আগে নিরাপত্তা জোরদার করতে আগাম পদক্ষেপ হিসেবে ১৩৫ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি
নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্তত ১১ হাজারের বেশি সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সাইবার ক্রাইম শাখাই প্রায় আট হাজার পোস্ট অপসারণ করেছে।
![]()
বিপুল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন
ভোটের আগে রাজ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ২,৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করে নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ রাখতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
তবে এই বিপুল বাহিনী মোতায়েন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব অভিযোগ করেছে, যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়াই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বাড়ছে উত্তাপ
তৃণমূলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে স্বচ্ছতা না থাকায় পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সংঘর্ষ, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















