দীর্ঘ দুই দশকের আলোচনা, বিলম্ব ও বিতর্কের পর অবশেষে গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করেছে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্ট। এই আইনের মাধ্যমে দেশের লাখো গৃহকর্মী প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা পাচ্ছেন।
দুই দশকের পথচলা: ২০০৪ থেকে ২০২৬
গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিলটি প্রথম আনা হয়েছিল ২০০৪ সালে। উদ্দেশ্য ছিল প্রায় ৪২ লাখ গৃহকর্মীর অধিকার নিশ্চিত করা, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। দীর্ঘ সময় ধরে বিলটি নানা কারণে আটকে থাকলেও অবশেষে ২০২৬ সালে এটি আইনে পরিণত হলো।
এর আগে গৃহকর্মীরা শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেতেন না। ফলে তারা অনানুষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণহীন খাতে কাজ করতেন, যেখানে শোষণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের ঝুঁকি ছিল বেশি।
আইনের মূল লক্ষ্য ও সুবিধা
নতুন আইনের মাধ্যমে গৃহকর্মীদের জন্য আইনি নিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে। এতে শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা—দুই পক্ষের জন্যই স্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনের আওতায় গৃহকর্মীরা এখন পাবেন পেশাগত প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং বেকার ভাতা। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের বৈষম্য, শোষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিশু শ্রমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা
আইনটি বিশেষভাবে ১৮ বছরের নিচে শিশুদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় এখনও অনেক শিশু শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারে না, ফলে এই খাতে শিশু শ্রমের প্রবণতা ছিল। নতুন আইন সেই প্রবণতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা
যদিও আইনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি, তবে আগামী ১২ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এতে আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য শাস্তির বিষয়টিও নির্ধারণ করা হবে।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই আইনকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এতদিন অবহেলিত এই শ্রমজীবী নারীরা এখন প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি ও সুরক্ষা পাচ্ছেন।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, শুধু আইন করলেই হবে না—নিয়োগকর্তাদের সচেতন করতে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন।

নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গৃহকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৩০০টির বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসবের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ এমনকি মানবপাচারের ঘটনাও রয়েছে।
২০২৩ সালে রাজধানী জাকার্তায় এক তরুণ গৃহকর্মীর ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে মারধর, সিগারেট দিয়ে পোড়ানো এবং শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।
শ্রম সংস্কারের প্রেক্ষাপট
দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের কল্যাণ বাড়ানো ও শ্রম সুরক্ষা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কর্মসংস্থান সংকট ও শ্রম পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই এই আইন পাস হওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















