উত্তর-পূর্ব জাপানের উপকূলে শক্তিশালী ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর দেশটির আবহাওয়া সংস্থা আরও বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা জানিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। সোমবারের এই কম্পনের পর উপকূলজুড়ে সুনামি আঘাত হানে এবং কয়েকটি অঞ্চলে ব্যাপক সতর্কতা নেওয়া হয়।
ভূমিকম্পের পরপরই জাপান আবহাওয়া সংস্থা ও মন্ত্রিপরিষদ দপ্তর যৌথভাবে জানায়, হোক্কাইডো থেকে চিবা পর্যন্ত ১৮২টি পৌর এলাকায় বাসিন্দাদের যেকোনো সময় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। মানুষকে তাদের আশ্রয়পথ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জরুরি পরিকল্পনা নতুন করে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে অতীতে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। তাই আগামী এক সপ্তাহ, বিশেষ করে প্রথম দুই থেকে তিন দিন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বড় ধরনের ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেড়ে প্রায় ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০১৫ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক শক্তিশালী কম্পন হয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ভূমিকম্পের বিস্তারিত
সোমবার বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে ইওয়াতে উপকূল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রের ২০ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। জাপানের ভূকম্পন মাত্রায় কিছু এলাকায় এর তীব্রতা ৫ থেকে ৭ পর্যন্ত পৌঁছায়। টোকিওতেও কয়েক মিনিট ধরে দুলতে থাকে ভবনগুলো।
দুইজন সামান্য আহত হয়েছেন—একজন ইওয়াতে এবং অন্যজন আओমোরিতে। এছাড়া স্কুল ও রেস্টুরেন্টসহ ২৬টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুনামি ও ক্ষয়ক্ষতি
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন এলাকায় সুনামি আঘাত হানে। ইওয়াতের কুজি বন্দরে ৮০ সেন্টিমিটার, মিয়াকো বন্দরে ৪০ সেন্টিমিটার ঢেউ রেকর্ড করা হয়। হোক্কাইডো ও মিয়াগিতেও ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ঢেউ দেখা গেছে।
প্রাথমিকভাবে ৩ মিটার পর্যন্ত সুনামির সতর্কতা জারি হলেও পরে তা হ্রাস করা হয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয় বলে সতর্কতা বহাল রাখা হয়েছে।

উদ্ধার ও সতর্কতা ব্যবস্থা
প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংকট ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র চালু করেছে। উদ্ধার কার্যক্রম ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
আওমোরি অঞ্চলে প্রায় ১০০টি পরিবারের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিবহন ও অবকাঠামো
কিছু ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে। শিনকানসেন লাইনের পরিষেবাও আংশিক বন্ধের পর পুনরায় চালু করা হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরবর্তী কয়েক দিনে ভূমিধসসহ গৌণ দুর্যোগের আশঙ্কাও রয়েছে, বিশেষ করে বৃষ্টিপাত হলে ঝুঁকি বাড়বে।
সরকার জনগণকে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে বললেও যেকোনো মুহূর্তে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে জোর দিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় কম্পন অনুভূত হলে বা সুনামি সতর্কতা জারি হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির স্মৃতি আবারও সামনে এনে দিয়েছে এই ঘটনা, যখন প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















