সৈয়দা ফাতিমা বতুল বড় হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ভাষণ শুনে। তিনি বলেন, “বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শিয়া মুসলিমের মতো আমিও তাকে আমার ধর্মীয় ও নৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে বেছে নিয়েছি।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তান এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এলেও, দেশের ভেতরে এর প্রভাব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে নেতৃত্ব।
১৮ মার্চ, যখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার প্রধান সংযোগ হিসেবে সামনে আসেন, তার কয়েকদিন আগে তিনি দেশের শীর্ষ শিয়া আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা দেখা দেয়। এই বৈঠককে সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

সেনাপ্রধান সতর্ক করে বলেন, “অন্য দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভিত্তিতে পাকিস্তানে সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।” বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন আলেম জানান, পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। অন্যরা বলেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।
তবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা পেলেও, দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ আরও গভীর হয়েছে। এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই উগ্রপন্থী সহিংসতার শিকার।
ইরান যুদ্ধ এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে—জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের পরেই এর অবস্থান। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাত আবারও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নতুন ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পাকিস্তানের প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মধ্যে শিয়ারা সংখ্যালঘু। তাদের অনেকেই “বিলায়াত আল-ফকিহ” মতবাদে বিশ্বাস করেন, যা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দেয়।
শিয়া কর্মী সৈয়দ আলী আওয়াইস বলেন, “আমরা পাকিস্তানি। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলা হলে নীরব থাকা সম্ভব নয়। আমরা শোক প্রকাশ করলে গুলির মুখে পড়ি।” তিনি জানান, করাচিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে হামলার সময় নিহতদের মধ্যে তার বন্ধু সৈয়দ আদিল জায়েদিও ছিলেন।

দেশজুড়ে শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকসভা ও সমাবেশে খামেনির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন দেখা যাচ্ছে। অনেক আলেম এই সংঘাতকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরছেন এবং সপ্তম শতাব্দীর কারবালার যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করছেন।
করাচির একটি শিয়া অধ্যুষিত এলাকার মসজিদে ১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে পাকিস্তান ও ইরানের পতাকা হাতে জনতা খামেনির উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গের প্রস্তুতির কথা জানায়।
এই সময়ে আলেমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি।
একজন আলেম বলেন, “খামেনির শাহাদাত আমাদের দুর্বল করেনি; বরং বৈশ্বিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে।” তার বক্তব্যের পর জনতা “আমেরিকার মৃত্যু হোক” এবং “ইসরায়েলের মৃত্যু হোক” স্লোগান দেয়।
গ্যালাপ পাকিস্তানের প্রধান বিলাল গিলানি বলেন, এই সংঘাত “ম্লান হয়ে যাওয়া আমেরিকা-বিরোধী মনোভাবকে আবার জাগিয়ে তুলছে।” ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর এই মনোভাব কমে গিয়েছিল। তবে খামেনির মৃত্যুর পর গিলগিট-বালতিস্তানের কিছু শিয়া আলেম আমেরিকান পর্যটকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপও অনেক শিয়াকে ক্ষুব্ধ করেছে। দেশটি ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সেনা মোতায়েন করেছে।

১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তির পর পাকিস্তান সফরের ইঙ্গিত দিয়ে দেশটির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
একজন শিয়া প্রকৌশলী বাকির কারবালাই বলেন, “দেশের ভেতরের মানুষের বড় অংশ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করে, তখন ট্রাম্পের প্রশংসার কোনো অর্থ নেই।” তিনি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও জনমতের মধ্যে স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতার কথা উল্লেখ করেন।
যদিও খামেনির মৃত্যুর পরের অস্থিরতা এখন কিছুটা কমেছে, কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে আবার সক্রিয় করে তুলতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাড়াতে পারে।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর পাকিস্তানের শিয়াদের প্রতি ইরানের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তোলে, যা ১৯৯০-এর দশকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে উসকে দেয়।
বিশ্লেষকরা বলেন, লেবানন বা ইরাকের মতো সরাসরি হস্তক্ষেপের বদলে পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাকেই অগ্রাধিকার দেয় ইরান।

২০২৪ সালে পাকিস্তান জয়নাবিয়ুন ব্রিগেডকে নিষিদ্ধ করে। এই শিয়া গোষ্ঠীকে ইরান-সমর্থিত বলে মনে করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করা ও পাকিস্তানে সুন্নি আলেমদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।
অনেক শিয়া ইরানকে সুন্নি জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে দেখেন। চলতি বছরে ইসলামিক স্টেটের হামলায় অন্তত ৩৩ জন শিয়া নিহত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বড় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ইরানে ধর্মীয় নেতা বা পবিত্র স্থানে হামলা অব্যাহত থাকলে শিয়া তরুণদের মধ্যে উগ্রতা বাড়তে পারে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বা বিদেশে গিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
করাচির শিয়া এলাকাগুলোতে এখন মোজতবা খামেনির ছবি তার বাবার ছবির পাশে টাঙানো হচ্ছে, যা অনুসারীদের কাছে ধারাবাহিকতার প্রতীক।
বিলায়াত আল-ফকিহ মতবাদের অনুসারীদের কাছে এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার। তাদের বিশ্বাস, এই নেতৃত্ব চলবে মাহদির প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত—যাকে শিয়া বিশ্বাসে বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দেখা হয়।
সৈয়দা ফাতিমা বতুল বলেন, “এটা সীমান্ত বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের কাছে এটি এমন এক বিশ্বাস, যা চারপাশে যা-ই পরিবর্তন হোক, টিকে থাকবে।”
জিয়া উর-রেহমান 



















