ইরান–তুরস্ক সীমান্তে মানুষের ভিড়, মুখে নানা মত—কেউ সরকারের পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কিন্তু মতভেদ যতই থাকুক, সবার কথায় একটাই বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দেশজুড়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের চাপ। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সীমান্ত পেরোনো মানুষের অভিজ্ঞতা
তুরস্কের কাপিকয় সীমান্ত চৌকিতে এই সপ্তাহে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা ইরানের বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কেউ আত্মীয়দের বিদায় জানাচ্ছেন, কেউ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ তুরস্কের ভান শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন নিয়ে দরকষাকষি করছেন।
৩৮ বছর বয়সী মোজি কয়েক মাস ইউরোপে কাটিয়ে দেশে ফিরছিলেন। বিদেশে থেকেও তিনি মানসিক চাপে ছিলেন, কারণ সীমান্তবর্তী উর্মিয়ায় থাকা তার পরিবার নিয়ে উদ্বেগ ছিল প্রবল। নিরাপত্তা কারণে তিনি নিজের পুরো পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। এমনকি অনেকেই কথা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন, কারণ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে স্পষ্ট।

অর্থনীতির চাপে নিত্যদিনের সংগ্রাম
মোজি জানান, তার অনুপস্থিতিতে তার বাবা–মায়ের বাড়ির কাছেই বিমান হামলা হয়েছিল। উর্মিয়ার মানুষ এখন খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। কাজের অভাব আর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আয় কমে গেছে অনেকের।
এক দম্পতি, যারা পোশাক তৈরির কাজ করেন, বলেন—যুদ্ধের আগেই অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছিল। বছরের অর্ধেক সময় তাদের কোনো কাজ থাকত না। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
আরেক নারী বলেন, ছাঁটাই বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তার প্রত্যাশা গণতন্ত্র নয়, বরং এমন একজন শাসক যিনি কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
মতভেদ থাকলেও বাস্তবতা একই
৩৭ বছর বয়সী মিলাদ, পশ্চিম ইরানের খোয়ি শহরের বাসিন্দা, তুরস্কে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছিলেন। তিনি সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে বলেন, বড় শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকা ইরানের জন্য গর্বের বিষয়।
তিনি তার পাসপোর্ট দেখিয়ে বলেন, আগে বিদেশে অবমূল্যায়নের শিকার হতেন, এখন পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে তাবরিজ থেকে আসা এক নারী সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি চান, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়ে বরং সংঘাত চলতে থাকুক, যাতে বর্তমান সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।

যুদ্ধবিরতি, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
মোজির মতে, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে জানুয়ারির বিক্ষোভ দমন অভিযান থেকে শুরু করে যুদ্ধ—সব মিলিয়ে মানুষের ওপর মানসিক চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, সবাই ভালো কিছু আশা করে, কিন্তু বাস্তবে সেই পথ তৈরি হচ্ছে না। বরং মানুষকে মানসিকভাবে ভুগতে হচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে আরও পিছিয়ে যেতে হচ্ছে।
সমগ্র চিত্র
ইরানের মানুষ আজ দ্বিধাবিভক্ত—রাজনীতি ও যুদ্ধ নিয়ে তাদের মত আলাদা। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কাজের অভাব, মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ইরানে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ—এই বাস্তবতা এখন সীমান্ত পেরিয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















