পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফাতেই মুর্শিদাবাদ জেলায় নজিরবিহীন ভোটের হার দেখা গেল। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ব্যাপক নাম কেটে দেওয়ার ঘটনার পর মানুষ আর ঝুঁকি নিতে চাননি। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, আর ভোটারদের মধ্যে ছিল এক ধরনের উদ্বেগ—ভোট না দিলে তালিকা থেকে নাম হারিয়ে যেতে পারে।
নির্বাচনী তালিকার বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল এই জেলাতেই। সেই প্রেক্ষাপটে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল আশঙ্কা। রানিনগর কেন্দ্রের গয়াশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে এসে আমির আলি জানান, অনেকের নাম বাদ পড়েছে, তাই কেউই এবার ভোট না দিয়ে ঝুঁকি নিতে চান না। ভোট দিলেই তালিকায় নাম টিকে থাকবে—এই বিশ্বাসেই সবাই কেন্দ্রে ভিড় করছেন।
উচ্চ ভোটের হার ও সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলায় ভোট পড়েছে ৯৩.৫৫ শতাংশ। যেসব কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল, সেখানেই ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ। সামসেরগঞ্জে ৯৬.০৪ শতাংশ, লালগোলায় ৯৬.৪৫ শতাংশ, ভগবানগোলায় ৯৬.৯৫ শতাংশ এবং রঘুনাথগঞ্জে ৯৬.৯ শতাংশ ভোট রেকর্ড হয়েছে। এই চারটি কেন্দ্রেই নাম বাদ পড়ার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য, যা সরাসরি ভোটের প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে।
ডোমকলের রঘুনাথপুর এলাকায় ভোটার সাবির আহমেদ জানান, তাঁদের এলাকায় অন্তত ১২ জনের নাম তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবাই আতঙ্কে ছিলেন, তাই কেউ ভোট মিস করতে চাননি। একই ধরনের উদ্বেগ শোনা গেছে রেজিনগরের তারিণী সুন্দরী বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ানো ভোটারদের কাছ থেকেও। তুহিনা বিবি বলেন, তালিকা সংশোধনের পর গ্রামজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, অনেকের নাম এখন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
প্রতিবাদ ও বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা

নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে সামসেরগঞ্জের দিগ্রি গ্রামে প্রায় ২০০ মানুষ নীরব বিক্ষোভ দেখান। একইসঙ্গে বিকেলেও বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। নবগ্রামের ভোলাডাঙা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে দেখা যায় ভোটারদের ভিড়। ইনজামাম শেখ বলেন, তাঁর পরিবারে সবার নাম তালিকায় থাকলেও তিনি ভোট দেওয়াকে অত্যন্ত জরুরি মনে করছেন, কারণ অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।
এদিকে ভোটগ্রহণ সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার ঘটনাও ঘটে। নওদা কেন্দ্রে একটি রাজনৈতিক দলের নেতার গাড়িবহর অবরুদ্ধ করা হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং স্থানীয়দের একাংশ গাড়িতে পাথর ছুড়ে আক্রমণ চালায়। একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।
তবে সব মিলিয়ে, নাম কাটার আতঙ্কই এই নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে ভোটারদের কেন্দ্রে টেনে এনেছে—এটা স্পষ্ট। ভোটারদের বড় অংশই মনে করছেন, ভোট দেওয়া মানে শুধু প্রতিনিধি বেছে নেওয়া নয়, নিজের অস্তিত্বও নিশ্চিত করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















