পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণে নজিরবিহীন উপস্থিতি দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার এই দফায় ভোটদানের হার ৯২ শতাংশেরও বেশি, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। তবে এই রেকর্ড শতাংশের আড়ালে রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—মোট ভোটারের সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভোটের হার বাড়লেও কমেছে মোট ভোটার
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবার এই ১৫২টি আসনে প্রায় ৪৭ লক্ষ কম মানুষ ভোট দিয়েছেন ২০২১ সালের তুলনায়। অর্থাৎ শতাংশের দিক থেকে রেকর্ড হলেও বাস্তবে ভোটার উপস্থিতি কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। এর বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর, যার ফলে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় বড় কাটছাঁট
গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় মোট ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা কমেছে ১১.৬৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের মতে, মৃত, স্থান পরিবর্তনকারী, একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত বা যাচাইকালে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নামই মূলত বাদ দেওয়া হয়েছে। খসড়া পর্যায়ে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ে, পরে নোটিস ও আপিল পর্যায়ে আরও ৩২ লক্ষ নাম মুছে ফেলা হয়।
রাজনৈতিক তর্কে এসআইআর
এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছেন এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে এই ইস্যু বড় হয়ে ওঠে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে বিজেপি দাবি করে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নামই সরানো হয়েছে।
ভোটে উচ্ছ্বাস, ব্যাখ্যায় বিভাজন
ভোটগ্রহণ শেষে উভয় দলই এই উচ্চ ভোটদানের হারকে নিজেদের পক্ষে ব্যাখ্যা করেছে। তৃণমূলের মতে, মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছে, এই ফলাফল তাদের জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মুর্শিদাবাদে ভোটারদের সংগ্রাম
এসআইআরের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায়। এখানকার এক পরিযায়ী শ্রমিক রোশন আলি জানান, চেন্নাই থেকে ভোট দিতে ফিরতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ট্রেনে জায়গা না থাকলেও তাকে ফিরতে হয়েছে, কারণ ভোটার তালিকায় নাম থাকা তার জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে কাজ করতে গেলে ভোটার পরিচয়পত্রই প্রথম যাচাই করা হয়—এই কারণেই ভোট দিতে আসা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষ ব্যবস্থা ও বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেমন মাইক্রো পর্যবেক্ষক, বিচারিক কর্মকর্তা ও আপিল ট্রাইব্যুনাল নিয়োগ। যাঁরা নথি জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যেও প্রায় ২৭.১০ লক্ষের নাম বাদ পড়ে। পরে আপিলের জন্য ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও খুব অল্প সংখ্যক নামই পুনর্বহাল হয়েছে।
সার্বিকভাবে, রেকর্ড ভোটদানের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও ভোটার তালিকার এই বড় পরিবর্তন নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















